এই পর্বটি খুব একটা বড় করে লিখতে পারিনি নিজস্ব ব্যাস্ততার কারনেই । প্রতিটি তথ্য বার বার করে ভেরিফাই করে এবং তথ্য সূত্র গুলোর থেকে বার বার না লিখবার অনুরোধ, আমাকে অনেকটা দ্বিধাগ্রস্থ করে তুলেছিলো । এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমি অন্তঃত পক্ষে কথা বলেছি রাউজান,গহিরা,রাঙ্গুনিয়া,ফটিকছড়ি এবং চট্রগ্রামের অন্যান্য এলাকার কমপক্ষে ষাটজন মানুষদেরও উপরে । তথ্য সংগ্রহ করেছি ইন্তারনেট থেকে, ব্যাক্তিগত মেইলে,টেলিফোনে,পত্রিকা এবং অন্যান্য ব্যাক্তিগত সূত্রে । সবচাইতে মজার ব্যাপার হচ্ছে, যখনই কেউ জানতে পারলো এই তথ্যগুলো নেয়া হচ্ছে ব্লগে সাকা পশুটিকে নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করবার জন্য তখনই আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, সবাই কেমন করে যেন পিছিয়ে যাচ্ছেন । একজন তো বলেই বসলেন, ভাই এতক্ষন যা বলেছি তা ফাজলামি করলাম, আর আমার নাম আসলে ***** এইটা না । তারপর হঠাত করেই, “ভাই বাদ দেন । এসব লিখে কি হবে ?” এই জাতীয় কথা বলা শুরু করলেন । আমার গোঁ দেখে তিনি শেষ পর্যন্ত আসল কথা বলেই বসলেন, “ভাই প্লিজ আমার নাম টা ব্যাবহার করবেন না । বুঝেনই তো, আমাকে চিটাগাং ফেরত যেতে হবে ।”
আমি এইসব শুনে হতাশ হই । ভেতরটা কি এক কষ্টে পুড়ে খাক হয়ে যেতে থাকে । এই ভয় আর এই আতংক লন্ডনে এসেও তাদের দুদন্ড শান্তি দেয় নি । সাকা এমনই এক পশু । এমনই তার দাপট । কি এক অজানা ক্রোধ আমাকে চেপে ধরে । জানিনা শরীরে আগুন লেগে গেলে কি হয় । আমার ভেতরের তাপ যেন ক্রমাগত বাড়তেই থাকে । শুধু এইটুকু টের পাই, একজন মানুষ হয়ে সাকা নামের পশুটিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি প্রতিটি মুহূর্তে ক্লান্ত হই…শ্রান্ত হই ।
প্রথম পর্বের পর –
চিকদাইর ইউনিয়নের ফল্লাতলী থানার মেয়ে ছিলো সুলতানা । গরীব ঘরের হওয়ার কারনেই ভাগ্য পরিবর্তনের তাগিদে মানুষের বাসাতে কাজ করতে হতো সুলতানাকে । ওই গ্রামেরই আরেক ভদ্রমহিলা আশ্রাফুন্নেসা , যিনি ফকা চৌধুরীর বাসাতে প্রায় দশ বছর ধরে কাজ করেছিলেন, তারই সূত্র ধরে সুলতানা কাজ করতে আসেন ফকার গহিরার বাড়ীতে । ফকার স্ত্রী’র (যাকে মনু নামে ডাকা হতো কেতাবি নাম জানা যায়নি) শারীরিক সমস্যাজনিত কারনে তাদের বিয়ের প্রথম দশ বছরেও কোনো সন্তান হয়নি । এই নিয়ে অবশ্য কোনো ধরনের পারিবারিক অসন্তোষ না থাকলেও, সুলতানার সাথে ফকার শারীরিক সম্পর্কের কথা নিয়ে ফকার পুরো পরিবারেই একটা কানা ঘুষা চলতে থাকে ।
মূলত ফকার রক্ষিতা হিসেবেই সুলতানাকে ব্যাবহার করা হতো । ওই সময়ে পারিবারিক এই ধরনের ব্যাপারগুলো মূলত প্রতিরোধের থেকেও, দ্রুত চাপা দেওয়ার চেষ্টা চালানো হতো । আর ফকা অবস্থানগত ও সম্পদগত দিক থেকে এতটাই শক্তিশালী ছিলো যে,ফকা যদি তার স্ত্রী্র সামনেও কাউকে ধর্ষন করত তাহলেও আসলে কিছু করার ছিলো না । সে সময় রাজনৈতিক ভাবেও ফকা একটি শক্তিশালী অবস্থানে দাড়িয়েছিলো । সুলতানার গর্ভে সন্তান আসার পর তা আর গোপন থাকেনি । এই ধরনের খবর গুলোর যে অদৃশ্য পা থাকে, সে পায়ের জোরেই খবর গুলো বেশ চাউর হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পরে । কিন্তু ফকার যে অবস্থান গত শক্তির কথা আগেই বলা হয়েছে, তার জোরেই এই ধরনের খবরগুলো আসলে ঠিক ফকার মত লোকদের জন্য থামিয়ে দেয়া খুব একটা কঠিন হয় না ।
সুলতানার সন্তান জন্ম নেওয়ার পরের সাত মাসেও সুলতানাকে ফকার বাসাতেই দেখা যায় । এবং একটা পর্যায়ে ছড়ানো হয় যে সুলতানা, ফকার বাসায় থাকা রাখাল হাবিবের সাথে চুরি করে ভারতে পালিয়েছে । এবং সুলতানার গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তান আসলে হাবিবেরই ফসল । কতটা হাস্যকর হলে এই যুক্তি দেয়া যায় যে, ফকার মত প্রভাবশালী লোক এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেয় নি । হাবিব আর সুলতানাকে আর কখনোই কোথাও দেখা যায়নি কিংবা খুঁজে পাওয়া যায়নি । বলা হয়ে থাকে, সুলতানা ও হাবিবের কবর ফকার বাড়ীর চৌহদ্দীর ভেতরেই দেয়া হয়েছিলো ।
সবচাইতে চমকপ্রদক তথ্যটা হলো, সুলতানার পরিবার থেকেও আর কোনো রকম প্রতিবাদ কিংবা পদক্ষেপের কথা কখনই শুনা যায়নি , আর দশটা সাধারণ হারিয়ে যাওয়া মানুষের মতন সুলতানাও কখনো ফিরে আসেনি । আর হাবিবের ব্যাপারটা আরো বেশী সহজ সাধ্য ছিলো, কেননা বাবা-মা মরা এতিম ছেলে খুব ছোট বেলা থেকেই ফকার বাসাতেই বড় হয়েছিলো । সুতরাং সে হারিয়ে গেলেও কারো হয়তবা কিছু যায় আসে নি । এর মধ্যেই মোটামুটি চাউর করে ঘোষনা করা হয় সাকার জন্মের কথা । চোধুরী পরিবারের প্রথম ছেলে সন্তানের কথা ।
পারিবারিক ভাবে ফকার পরিবারে এই মিথটিই প্রচলিত যে, সাকা আসলে সুলতানার গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তান । ( এই ঘটনা এবং ব্যাবসায়িক ও সম্পত্তির মালিকানা সঙ্ক্রান্ত অন্যান্য আরো কিছু ঘটনার সূত্র ধরেই এখন সাকার আরো দুই ভাই, গিয়াসুদ্দিন কাদের চৌধুরী ও সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে সাপে নেউলে সম্পর্ক চলছে । যা আপনাদের পরবর্তী পর্ব গুলোতে বিস্তারিত বলা হবে) আগেই বলে নেয়া প্রয়োজন, এই ধরনের তথ্যগুলোর সবচাইতে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ঠিক প্রমান সহ কোনো ধরনের দলিল দস্তাবেজ থাকেনা । কিন্তু আমি যার কাছে সাকার পারিবারিক ও ভেতরকার কীর্তিকলাপ গুলোর খোঁজ খবর নিয়েছি তার তথ্য সূত্র আমার কাছে বরাবরি অথেন্টিক মনে হয়েছে । সাকার পরিবারকে তিনি ছোট বেলা থেকেই খুব কাছ থেকে দেখেছেন । সুতরাং পারিবারিক এইসব ঘটনাগুলোর অনেক কিছুরই সাক্ষী তিনি ।
একটা সময় ফজলুল কাদেরের ভয়ে ও দাপটে একটা জীবন অতিবাহিত হলেও আজ সন্তানদের সুবাদে লন্ডনে স্থায়ী ভাবে বাস করছেন । বার বার তিনি আমার কাছে তার নাম না প্রকাশ করবার শর্তে অনেক গল্পই করেছেন , যা শুনে এই নিরাপদ একটি দেশেও আমি ঘেমে উঠেছি বার বার । আতংকে চমকে উঠেছি । আপনাদের একটি কথা এখন না বলেই নয় যে, প্রায়ই কথা উঠে থাকে, সাকা চৌধুরী লন্ডনে ১৯৭১ সালের মহান যুদ্ধে দেশেই ছিল না । পশুটি নাকি ছিল লন্ডনে । সেখানে সে নাকি লিঙ্কন্স ইন থেকে আইন বিভাগে পড়াশোনা করেছে এবং ব্যারিস্টার ডিগ্রী অর্জন করেছে । এই একটি মাত্র তথ্য জানতে আমাকে কয়েকবার চ্যান্সারি লেনের লিঙ্কন্স ইনে দৌড়াতে হয়েছে । কারো ব্যাক্তিগত তথ্য যেহেতু লিঙ্কন্স ইন অথরিটি দেয়না সুতরাং আমাকে এক্ষেত্রে অন্য একটি পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছে । প্রথমেই বলে নেই যে, লিঙ্কনস ইন আইন বিষয়ে কোনো সাবজেক্টের কোনো ধরনের টিউশন দেয়না । লিঙ্কন্স ইন একটি অনারারী সোসাইটি যারা বার-এট-ল করছে এমন ছাত্র-ছাত্রীদের মধাহ্ন এবং নৈশকালীন ভোজনের ব্যাবস্থা করে এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে সেসব ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যারিস্টার হিসেবে ঘোষনা করে । বার এট ল কোর্স সম্পন্ন করতে হলে বাধতামূলকভাবে চারটি অনারারী ইনের যে কোন একটি ইনের সদস্য হতে হয় , এবং লিঙ্কন্স ইন সে সবের মধ্যে একটি ।
সুতরাং প্রথম ক্ষেত্রেই এটা খুব পরিষ্কার যে, সাকা কোনভাবেই লিঙ্কন্স ইন থেকে আইন বিষয়ে পড়েনি এবং এখান থেকে ব্যারিস্টারও হয়নি । ১৯৫০-২০০০ সালের যে লইয়ার্স লিস্ট, যা কিনা লিঙ্কন্স ইন এবং আরো তিনটি এইরকম অনারারী প্রতিষ্ঠানের সূত্র ধরে প্রকাশিত হয় একটি বই আকারে, সেখানে সাকার নাম পাই নি । আমাদের আরেক পোল্টিবাজ নেতা মওদুদ আহমেদ,শফিক আহমেদ,রফিকুল হক মিয়া প্রমুখের নাম পেলেও দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে সাকা নামের পশুটির নাম খুঁজে পেলাম না ।
যে কথা শুরুতেই বলছিলাম যে সাকার মত একটি নির্লজ্জ আর নির্মম পশুটির এখনকার কর্মকান্ডের পেছনে তার শৈশবের ইতিহাস জানা আমার কাছে খুব জরুরী মনে হয়েছে । সম্ভবত সাকা তার এই জন্মের ব্যাপারটি খুব স্বাভাবিক ভাবেই জানতে পেরেছিলো খুব অল্প বয়সেই , যার সাথে সাথে পরিচিত হয়েছিলো তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভয়াবহ রকমের হিন্দু বিদ্বেষের সাথে ,। রাউজান,গহিরা,রাঙ্গুনিয়ার মূলত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ছিলো । এখনো প্রচুর পরিমাণে হিন্দুদের বসবাস ওইসব এলাকা গুলোতে । ছোটবেলা থেকেই কঠোর ধর্মীয় অনুশাষন তথা ধর্মের নামে বাড়াবাড়িরই শিক্ষা দেয়া হয়েছিলো । ফকা চোধুরী্র প্রচন্ড শাষন আর বাড়াবাড়ি রকমের নিয়ম কানুনের মধ্যে দিয়ে তার জারজ সন্তান সাকা ধীরে ধীরে বিগড়ে যেতে থাকে ।
(চলবে) —