অনু-পরমাণু

01awcax3iqjzwaaaabaaaaaaaaaaa_

উতসর্গ আর আবজাব -
কবি জিফরান খালেদ , প্রিয়তমেষু । হাজারো দুঃখ আর কষ্ট যে সন্তর্পনে লালন করে ।

এটা কি গল্প না কি বিষদ একটা বিষাদ বয়ান জানি না । এই লেখাটি শুরু করেছিলাম জুলাইয়ের আঠারো তারিখ দুইহাজার আটে । আজকে অক্টোবরের দশ তারিখ ,বছর পালটায় নাই । দুইহাজার আট ই আছে । মাঝখানের এই সময়টাতে আমি কোন গল্প লিখতে পারিনি কিংবা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি । একটা লেখা মানুষকে এতটা কষ্ট দিতে পারে এতটা যন্ত্রণা দিতে পারে আমি তা কখনোই ভাবিনি । লেখাটা যেমন ত্যাঁদড় , আমি তার থেকেও দুই কাঠি বেশী । সুতরাং অপেক্ষা আর অপেক্ষা । এত অপেক্ষার পর শেষ হলো আজ । ইচ্ছা করছে দুইটা ডিগবাজি খাই, কোল বালিশের মত গড়াগড়ি দেই… রাস্তায় গিয়ে প্রায় পাছা থেকে পড়ে যাওয়া প্যান্ট পরিহিত যুবক কে জিজ্ঞেস করি, “ ঘটনা কি ? প্যান্ট ঠিকমত পর গাধা !!…” আফসোস সভ্য সমাজে থাকি…করা হয়না কিছুই, বলাও না…

এক।
আমার কিছুই ভাল্লাগেনা । এই ধরনের একটি কথা আমার মাথায় বার বার আসলেও আমি ঠিক সে রকম করে বার বার বলতে পারি না । ভালো লাগা, না লাগা , মন খারাপ কিংবা ভালো নেই এই ব্যাপার গুলো একা একা মেনে নিতে ভাল্লাগে না । কাউকে না কাউকে বলতে ইচ্ছে হয় । বলাটা ঠিক কঠিন কিছুও নয় । মুখ দিয়ে খুব সহজেই এই কাজ টি করা যায় । কিন্তু আমার আশে পাশে সব মানুষ গুলোই এমন, যাদেরও কোন কিছুই ভাল্লাগেনা । সুতরাং মন খারাপ করার অতি জরুরী সংবাদটি কিংবা আমি ভালো নেই এই ব্যাপার গুলো আজকাল ঠিক জমে উঠেনা । তারপরেও আমার না ভালো লাগার ব্যাপারটি আমি কাউকে না কাউকে জানিয়ে দেই । আমার ভালো না লাগবার কথা শুনে আমার আশে পাশের মানুষগুলোর ঠিক তেমন ধরনের ভাবান্তর হয় না কিংবা তাদের চিন্তাগত তেমন একটা পরিবর্তন হয় না বলেই আমার ধারনা । কেবল মুখের অবস্থানগত একটা পরিবর্তন হয় । “ও আচ্ছা” জাতীয় বাক্যটি বলবার কারনেই কি না , কে জানে । আমি তাই আজকাল দীর্ঘক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি আর প্রায়ই ভাবার চেষ্টা করি এর শেষ কোথায় । অর্থহীন ভাবনা তো বটেই, আমার এপার্টমেন্ট ঘেঁসেই হাই স্ট্রীট ধরে প্রতিদিন অসংখ্য এবং গুনতে না পারার মত প্রচুর আর অচেনা মানুষ হেঁটে চলে যেতে থাকে । তাদের সবারই মনে হয় আমার মত “ভাল্লাগেনা” জাতীয় কষ্ট নেই । সবাই কেমন করে যেন হাসতে হাসতে চলে যেতে থাকে । সে হাসিকে আমি প্রায়ই খুব আনন্দিত, কম আনন্দিত , উচ্ছাসিত , উতফুল্য, এইসব মনগড়া ধারনা দিয়ে ঠিক-ঠাক করে নেই । আমি ঠিক ভেবে বের করতে পারিনা এইসব হাসির মূল অর্থ কি, আর কিই বা এমন কারন হলে মানুষ এমন করে হাসতে হাসতে সামনে চলে যেতে পারে । এইসব হাসির পেছনের মূল অর্থকেই কি তবে আমরা সুখ বলে থাকি ? কখনো সখনো আমি মানুষের এরকম আনন্দের রহস্য ভাবতে গিয়ে চূড়ান্ত কোন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই । তখন হেঁটে চলে যাওয়া মানুষ গুলোর মতন আমারো নাকের নীচের কাটা অংশটা লম্বায় বেড়ে যায় । আমি যাকে ক্ষীণ হাসি বলে থাকি । আমার এই হাসির পেছনে, সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবার একধরনের নিষ্ঠুর সুখ এলোপাথাড়ি ভাবে কাজ করতে থাকে । কখনো আমার খুব ইচ্ছে হয় একদিন কাউকে জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করি, ঘটনা কি ? কিন্তু আমি নেহায়েত একজন ভীতু মানুষ বলেই এই ধরনের চিন্তাগুলোকে কখনই খুব একটা পাত্তা দিতে পারিনা । সভ্য সমাজে বেঁচে থাকাটাই আসলে ভীষন একঘেঁয়ে , মন যা চায় তা ঠিক করা যায় না । পাশের ফ্ল্যাটে এক বয়ষ্ক কাপল থাকেন । আমার সাথে দেখা হলেই কেমন কাঁচুমাচু করে তাকান । একটা ভীত সন্ত্রস্ত অবয়ব বৃদ্ধের চোখে মুখে নিদারুন ভাবে ফুটে উঠে । আমার গোঁড়াতেই সন্দেহ ছিল আমি দেখতে কুতসিত । এই বৃদ্ধ কে যতবার সামনা সামনি দেখি ততবারই আমার চেহারা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত হই । মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে হয় গভীর রাতে বুড়োবুড়িকে ভয়ানক রকম ভয় দেখাই । এডগার এলেন পো’র গল্পগুলোর মতন । এইরকম একটা চিন্তা করে এক হেলোয়েনের উতসবে আমি কয়েকটা মুখোশ কিনে এনেছিলাম । মুখোশ না কিনলেও চলত । রাতের আলোতে আমাকে ভয়াবহ দেখায় । অনেক আগে আগুনে পুড়ে যাওয়া মুখের অংশবিশেষ দেখে আমি নিজেই আঁতকে উঠি । গভীর রাতে সে উদ্দেশ্যে দরজায় টোকাও দিয়েছিলাম । এরা হালুম শব্দের মানে বুঝবে কিনা এই সন্দেহ দূর না করেই মৃদু স্বরে হালুম বলেই খানিক্টা থেমে গেলাম । আমার নিজেরই কেমন যেন ভয় ভয় করছিলো । তারপর আর সাহসে কুলোয় নি । পরদিন এম্বুলেন্সের ভয়ানক বিকট চিতকারে ঘুম থেকে উঠে শুনি , দুই বৃদ্ধের একজন হাপিস । শ্বাস কষ্ট ছিলো নাকি বুড়োর । রাত তিনটার দিকে হাঁপানীর টান উঠেছিলো । মারা গেছে ভোর ছয়টার দিকে । কি করছিলাম আমি তখন ? বিকট মুখোশ টা পরে হাত পা ঝাঁকিয়ে আমার ঘরে নাচছিলাম মনে হয় । খানিকটা হেলে দুলে । বৃদ্ধের মৃত্যুটা আমাকে আরো বেশী সাহসী করে তুলেছিলো । এরই নাম ক্রুর হাসি কিনা জানিনা , তবে আমার বীভতষ মুখ জুড়ে একটা জঘন্য হাসি লেগেছিলো । সপ্তাহের শেষ দিনগুলোয় বুড়িকে একা পেয়ে ভয় দেখানো যাবে , এই ব্যাপারটি আমাকে প্রবল আনন্দ দিচ্ছিলো । কিন্তু দেখা গেলো পুরোপুরি নিয়ম ভেঙ্গে বুড়ির বড় মেয়ে, বেকি ( যার সাথে সব সময় একটা বিশাল গ্রে হাউন্ড থাকে ) মাল পত্র নিয়ে বুড়ির সাথে থাকতে চলে এলো । সারাদিন সে কি হল্লা হাটি , হাসা-হাসি । তাদের এই আনন্দ, সুখ আমার ভাল্লাগতো না । বেকি দেখতে খুব সুন্দরী ছিলো । বেকিকে আমি তার কুকুর গুলোর জন্য ভয় পেলেও, তার জন্য আমার মনে একটা জায়গা ছিলো । কি সুন্দর দেখতে বেকি । মোমের মুর্তির মতন । আমি কখনো দেখিনি বেকির প্যান্টি পুরোপুরি ঢাকা । ট্রাউজারের ফাঁক দিয়ে প্যান্টি দেখার লোভে আমি সবসময়ই বেকি কে নিরবে অনুসরন করতাম । গভীর রাতে আমি যখনই বৃদ্ধার ফোন নাম্বারে ডায়াল করতাম , প্রতিবারই আমাকে “পুটকির ফুটা” গালিটুকু শুনেই ফোন রাখতে হতো । কেননা ফোনে আমি কোন কথাই বলতে পারতাম না । একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে বেকি বলে উঠল, “ইজ ইট জ্যামশেড ? ”। কি এক তীব্র আতঙ্ক আমাকে ঘিরে ধরেছিলো সেদিন । বেকি কি করে যেন বুঝে ফেলেছে । এরপর অবশ্য আর কোনদিন ফোন করা হয় নি । ধরা পড়ে যাবার ভয়টা আমাকে সবসময় অনুসরণ করে চলত । এখন অবশ্য আমি প্রায় রাতে ঢাকায় ফোন দেই । গভীর রাতে ফোন করে কোন কথা বলি না । বেশীর ভাগ সময় ভাইয়া ফোন ধরে । ভাইয়া কলতাবাজার সাহিত্য পরিষদের সভাপতি । কি সুন্দর করে কথা বলে । তার কবিতার ভেতর কি চমতকার, চমতকার শব্দ । কি অসাধারণ গল্প লেখেন ভাইয়া । অনেক মেয়েকেই দেখেছি মন্ত্র মুগ্ধের মত ভাইয়ার কথা শোনে ,ভাইয়ার জন্য পাগল । অথচ সে ভাইয়া কি বিশ্রী করে “ কোন হাউয়ার পোলা রে” বলে গালি দেয় । এরকম একজন মানুষের মুখে “ হাউয়ার পোলা” শব্দটি ঠিক মেনে নেয়া যায় না । যখন থেকে আমার বখে যাওয়া শুরু , সব আত্মীয়-স্বজন ,মা ( আমার বাবাকে আমরা কেউ দেখিনি , উনি কোথায় থাকেন মা আমাদের বলেন নি ) আমাকে দেখলেই যখন আঁতকে উঠত , সে সময় গুলোতেও ভাইয়া আমাকে ছেড়ে যান নি । প্রতিদিন একে তাকে মেরে-ধরে, চাঁদাবাজি করে যখন ঘরে ফিরতাম , ভাইয়া আমার ঘরে এসে তার নতুন লেখা কবিতা শোনাতেন । আমার বালিশের নীচে রাখা রিভলবার দিয়ে আমার প্রায়ই ইচ্ছে হতো ভাইয়াকে একটা বাড়ি দেই । এতটা সুখী হয়ে কি করে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে আমি ভাইয়াকে দেখে কোনদিনই শিখে নিতে পারিনি । একটা খুনের মামলায় ফেঁসে গিয়ে আমেরিকা আসার সময় এই ভাইয়াই শুধু আমার সাথে এয়ারপোর্টে এসেছিলো । ওইদিনই প্রথমবারের মত ভাইয়াকে আমি কাঁদতে দেখেছিলাম ।

দুই এবং পরিশিষ্টঃ

সুখ ব্যাপারটা সম্পর্কে আজকে আমার ব্যাপক ধারনা হলো । অথচ এতটা বছর আমাকে কি সুতীব্র এক যন্ত্রনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিলো । কি করে যেন সব জেনে গেছি টাইপ একটা বোধ আমার মধ্যে পোলয়েড কনার মত অবরাম দৌড়ে যেতে থাকল । এখনো আমার এপার্টমেন্টটার নীচে তাকালে দেখা যাবে হাজার হাজার সব সুখী মানুষেরা বড় রাস্তাটি ধরে সামনে চলে যাচ্ছে । আগের মতন তাদের মুখ গুলো হাসি হাসি করে রাখা । শীত-গ্রীষ্ম , বর্ষা যাদের কখনই ছোঁয় না । আমার মুখে একধরনের ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠেছে । আমি ধীরে ধীরে এ হাসির অর্থ বুঝে নিতে পারছি । আমি হয়ত আর বড় জোর ঘন্টা তিনেক বেঁচে থাকব । যে বস্তু আমার ভেতরে গেছে সে সম্ভবত আমার মতই অসুখী । হাজার চেষ্টাতেও আর ফিরে আসা যাবেনা । ধীরে ধীরে আমি নিস্তেজ হতে শুরু করেছি । ঠিক কতদিন পর আমার সতকার হবে সে সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই নেই, পুলিশ ,এম্বুলেন্স কখন আসবে সেসবের কিছুই জানি না । অনেক পরিচিত-অপরিচিত মানুষ গুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই বেকি থাকবে । ঠিক আগের মতন । ইষত প্যান্টি দেখা যাবে তার ট্রাউজারের ফাঁক ঘেঁসে ।

অথচ তাকে বলাই হলো না আমি কি পরিমাণ সুখী ছিলাম ।

ঘানার লেখক মলাগোফরুমা’র “ এলিজি অফ মাইসেলফ” পড়ে অনুপ্রাণিত ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.