“সাকা” একটি পশুর নাম (পর্ব-৫)

imagesপ্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত পাঠকদের কাছে এই পর্বটি একটু দেরীতে লিখেছি বলে । পাঠকদের একটি কথা না বললেই নয় যে, সাকা কে নিয়ে একটি পর্ব লিখতে যাওয়া মানেই কম করে হলেও সাত থেকে আট ঘন্টার মত লেগে যায় । রেকর্ডকৃত সাক্ষাতকার গুলো বার বার শুনে তা আবার লেখা, বিভিন্ন সূত্র থেকে লেখা বাছাই করা, ইংরেজী আর্টিকেল গুলোর অনুবাদ করা,একে-ওকে ফোন করে জানতে চাওয়া ইত্যাদি । যেমন ধরা যাক আমি এই পর্বটি লিখতে বসেছি গতকাল রাত ৮ টায় । আর এখন বাজে আজ সকাল ৫ টা । সুতরাং পাঠক, বুঝতেই পারছেন এই লেখাটি খুব সহজে লিখে ফেলা আমার জন্য সম্ভব হয়ে উঠছে না । তারপরেও দায়বদ্ধতা থেকেই যায় , একটি সিরিজে খুব বেশী সময়ের পার্থক্য হলে, সিরিজটিরই মান ও আগ্রহ ক্ষুণ্ণ হয় বলেই আমার ধারনা । তারপরেও আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করছি প্রতিনিয়ত । সামনের পর্বে সম্ভবত এই সিরিজট শেষ করতে পারব ,যদি আপ্নারা সব সময়ের মত পাশে থাকেন, উতসাহ দেন । আপনাদের উতসাহেই আমার মত অলস মানুষের এতদূর লিখে ফেলা । পেছনের পর্ব গুলোর দিকে তাকালে তাই বেশ অবাক হয়ে যাই ।

কথা না বাড়িয়ে শেষ করি । তবে শেষ করবার আগে পুরোনো সেই কথাটি আরেকবার বলি । কথাটি হচ্ছে, সাকা কে নিয়ে লিখতে আমার ভীষন ক্লান্ত লাগে । হতাশায় আর বিষন্নতায় আমি বার বার ব্যাধিগ্রস্থ হই । সাকার ভেতর এত বেশী অন্ধকার,যে লিখতে গিয়ে আমি বার বার হারিয়ে গেছি । কখনো ঘৃণায় , কখনো আতঙ্কে, কখনো বিষ্মিত হয়ে ।
একজন মানুষ হিসেবে সাকা’কে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি সেইসব অন্ধকার দেখে আজকাল ভারাক্রান্ত হয়ে থাকি । খুব এবং খুব ।

****************************************************************************************************

৪র্থ পর্বের পর-

নাহ্ । আমাদের এই সাম্রাজ্যও নেই । আমাদের ক্ষমতাও নেই । আমরা ক্ষমতাহীন এক কপর্দক হয়ে ভেতরের বিষবাষ্প,জ্বালা আর ক্ষোভ প্রায়ই ঘরের ভেতরে মিটিয়ে থাকি ।কখনো মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে কুত্তার বাচ্চা কিংবা আরেকটু এগিয়ে গেলে শুয়োরের বাচ্চা । এই পর্যন্তই । সে চিতকার আবার চারদেয়ালের ভেতর আছড়ে পড়ে আর খুব তীব্র রসিকতা হয়ে আমার কানের কাছে এসে ছুটে পালায় । এ গাল গুলো যেন আমাকেই ছোঁয় আমারই আক্রোশে প্রতিনিয়ত ।

আচ্ছা, পাঠক , আপনাদের কাছেই আমার একটা প্রশ্ন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কি কোন রাজনৈতিক নেতা জন্মেছে যে সাকার মত এই রকম ঔদ্যররথ পূর্ণ কথা বলে ?এমন কি কেউ আছে যে, ক্রমাগত দেশের প্রশাসন, বিচার ব্যাবস্থা ,আইন কাঠামো,সংবিধানের প্রতি আনাচে কানাচে আঘাত হেনে কথা বলে পার পেয়ে গেছে ? কিংবা কখনো বাংলাদেশের জনগণ তাকে ছেড়ে দিয়েছে ? তাহলে শুধু সাকার ব্যাপারটিতেই প্রতিটি সরকারের এমন জুজুর ভয় কেন ? বলেন শেখ মুজিব, বলেন মোশতাক,বলেন জিয়াউর রহমান,বলেন এরশাদ,বলেন খালেদা অথবা হাসিনা । কে সাকাকে একদন্ড দুঃখ দিতে পেরেছে ? কে পেরেছে সাকার বংশদন্ডের উপরিভাগের একটি কেশ এই জগত সংসারে নিয়ে আসতে ? কেউ পারে নি ।

সাকার তথ্য মতে খালেদা হয় কুকুর আর তার দুই পূত্র হয় কুকুরের বাচ্চা, শেখ হাসিনাকে জনগণের সামনে হতে হয় সাকার হলেও হতে পারত বধু , কিংবা মরহুম ওয়াজেদ নিম্নাঙ্গের বিস্তর বিবরণ দিয়ে হতে হয় রংগশালার পাত্রী, বর্তমান ও সাবেক আইন প্রতি মন্ত্রী ও পূর্ণ মন্ত্রীকে হতে হয় যথাক্রমে অর্বাচীন ও সুবিধাভোগী,মান্নান ভুঁইয়াকে হতে হয় নর্দমার পানি,জলিল সাহেবকে শুনতে হয় “কাকাদের দালাল”,মইন ইউ আহমেদকে হতে হয় বেঈমান,নির্বাচন কমিশনকে শুনতে হয় কেরাণী নাম দিয়ে হুঙ্কার,আদালত কে শুনতে হয় “কে আমার কোন বাল ফেলবে ?”বলে সুতীব্র চিতকার । আর আমরা আচোদা আর অথর্ব জনগণকে বিপুল যন্ত্রণা নিয়ে প্রতিটিদিন দেখতে হয় সাকা নামের পশুর কদর্য শারীরিক আস্ফালন আর মৌখিক ধর্ষন । তাই,আমাকে প্রশ্ন করবেন না প্লিজ । আমাকে বলবেন না, কেন হচ্ছে এসব ?

১৯৭২ সালে কিউ সি শিপিঙ্গের অনুমোদন আমি দেইনি । দিয়েছেন মহামতি বংগবন্ধু শেখ মুজিব । আমাদের বাবা । আমাদের জাতির পিতা । বন্ধুত্বের প্রতিটি কণার প্রতিটি মূহূর্তের স্বাক্ষর তিনি রেখেছিলেন । ফকার সাথে বেঈমানী করেন নি পিতা । পূত্রের কাছে চাবি তুলে দিতে দ্বিধা হয়নি শেখ মুজিবের । হোক না সাকা লন্ডনে , তাতে কি ? জামালুদ্দিন কাদেরের কাছে, গিয়াসুদ্দিন কাদেরের কাছে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, “বন্ধুত্ব মরে না হে অর্বাচীন ।”
(Graft, Confusion Peril Bengalis; Bangladesh Drifts in a Sea of Corruption and Confusion
নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক JAMES P. STERBA S ১৯৭২ সালের অক্টোবরের ৪ তারিখ, বুধবার, ১ নাম্বার পেইজে উপরের শিরোনামে একটি আর্টিকেল লিখেছিলেন শিপিং ব্যাবসার উপরে ততকালীন তাঁর প্রভাব নিয়ে এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক বিষয় নিয়ে । আশা করি সেই আর্টিকেলটা পড়লে আমার বলা কথা গুলোর সত্যতা বোঝা যেতে পারে । যদিও তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় ১৯৭২ । কিন্তু কিউ সি শিপিং জানায় ১৩ ই জুন ১৯৭৫ । যে সালটি হোক না কেন , বংবন্ধুর মৃত্যূর আগেই তা অনুমোদন দেয়া হয়েছিলো ।

সে জন্যই সম্ভবত সাকা বেশ ব্যাংগ ভরে মৃত বঙ্গবন্ধুকে “চাচা” সম্বোধন করে বলেছিলো,

”তিনি একজন ভদ্র মানুষ ও বড় মাপের রাজনীতিবিদ ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। আমিও চাচাকে সম্মান করি । আমার নেত্রীও তার কবর জিয়ারত করেছেন । “আমিও সুযোগ পেলে জিয়ারত করতে যাব।

১৯৭৫ সালে খন্দকার মোশতাক,পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান,তারপর লে যে হু মু এরশাদ,খালেদা জিয়া,শেখ হাসিনা,আবার খালেদা তারপর আবার শেখ হাসিনা, সবাই শুধু তেলের মাথায় তেল ঢেলেছেন এই বিগত দশক গুলোতে । সাকা নামের পশুটি হয়েছে সাম্রাজ্যশালী আর ক্ষমতার কেন্দ্র ।

QC Shipping Limited
Multiport Limited
QC Container Line Limited
Intermodal Transport
QC Petroleum Limited
Dacca Dyeing & Manufacturing Company Ltd.
QC Enterprises Limited
QC Trading Limited
QC Feeders Ltd
QC Textile Limited
QC Farms Limited
QC Foundation
Feedermax ( S ) Pte Ltd

এই যে উপরের ব্যবসা বিন্যাসটি দেখছেন তা , গত সাইত্রিশ বছরে সাকা ও তার পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্তের একটি নিদর্শন মাত্র । এইগুলো একদিনে হয়নি । প্রতিটি সরকার প্রতিটি আমলে সাকাকে ছাড়পত্র দিয়েছে ।আর সাকার এই ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গুলো বরাবরের মত অবৈধ অর্থ উপার্জনের এক একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার হয়ে এসেছে । প্রসঙ্গতঃ সাংবাদিক নাঈম মহাইমেনের একটি আর্টিকেলের কিছু অনুচ্ছেদ থেকে জানা যায় যে,
Assistant Police Superintendent of Ukhia Circle in Cox’s Bazar sent a report (Memo no.1811 dated 26.6.2000) to the Police Superintendent of Cox’s Bazar. The report quoted that on secret information the police had learnt that during the previous BNP regime (1991-96) Salahuddin Quader Chowdhury smuggled in modern arms and ammunition from different countries to supply to the Rohingya separatists. The Assistant Police Super also furnished a list of 12 illegal arms traders with Salahuddin’s name topping the list.

The Asia Times in its 6 February 2002 issue wrote in an article “Salahuddin Quader Chowdhury and his brother Giasuddin Quader Chowdhury both BNP leaders and alleged smugglers are actively involved in abetting fundamentalists, militant groups such as Harkat-ul-Jihad and rightist political parties such as JEI and IOJ”.

On 14 October 1996 a group of 12 motor bikers were coming out of Jetty # 3 of Chittagong Port where a ship of Q.C. Teal was moored. oticing their suspicious movement the police on duty challenged them and recovered 168 pieces of gold bars worth Taka 11.7 million. Also recovered from them was a delivery note of Q.C. Teal bearing number 954/96. All these 12 bikers were the employees of Q.C. Teal. In this connection a case was filed the same day 14 October 1996 with the Port Police station under Customs Act 165(8) and under Section 25B of Special Powers Act. Needless to mention that Salahuddin Quader Chowdhury owns Q.C.Teal.

এছাড়াও চট্রগ্রামে আটককৃত দশট্রাক অস্ত্র মামলায় সাকার জড়িত থাকার বিষয়টি বার বার সংবাদ পত্রে উঠে এসেছে । বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র চোরাচালানীর অভিযোগ হয়ে থাকলেও বার বার সব সরকারই সাকাকে ইড়িয়ে গেছে সুকৌশলে এবং অত্যন্ত বিনীতভাবে । কিছুদিন আগে, আইন প্রতি মন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম সাকার বিরুদ্ধে টিভি মিডিয়ায় সাহসী বক্তব্য রাখলেও কি এক দৈব কারনে, “সাকার সম্পর্কেও কথা বলতেও আমার ঘৃণা হয়” এই জাতীয় হাস্যকর কথা বলে ময়দান থেকে সরে পড়েছেন । আমরা আবাল পাবলিক হয়তো বুঝে নিই যে এই সরে যাওয়া ঘৃণা থেকে নয়, “বিরোধী দলকে ঘাটাইওনা” সূত্র থেকেই উদ্ভুত মাত্র ।

এরপর কথা বলতেই হয় সাকা আর নির্বাচন কমিশনের হয়ে যাওয়া বাক যুদ্ধের ।সাকা জানান দেয় তার অহমিকা আর প্রতাপের,
“যাদের সামনে আসামী হিসেবে দাড়াতে হবে তারা কারা ?তাহলে আমি একজন সংসদ সদস্য হয়ে কেন তাদের সামনে আসামীর কাঠগড়ায় দাড়াবো ?”

প্রবল প্রতাপ আর হম্বি তম্বি করা অসাড় নির্বাচন কমিশন সাকাকে তার অহংকারের ঝান্ডাকে মজমুত করবার আরো একবার সুযোগ করে দিলো । সাকার সদস্য পদ বাতিল করা হবে বলে সংবিধানের ১১৯ ও ৬৬ ধারার রেফারেন্স দেয়া হলো । গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১২ এর ৩(ক)এর কথা বলা হলো । একজন নগন্য ও অত্যন্ত অ-মেধাবী আইনের ছাত্র হয়েও, সংবিধানের পাতাগুলো ঘেটে এইটুকু বুঝেছিলাম, একটু পুরুষত্ব দেখালেই সাকাকে এ যাত্রায় ধরা সম্ভব । আমার এই প্রত্যাশার সাথে আরো যুক্ত হয়েছেন ড.কামাল হোসেন,ব্যারিস্টার আমিরুল হক প্রমুখ । যারা বলেছেন সাকার সংসদ সদস্যপদ বাতিল করবার পথে মূলতঃ কোন বাধাই নেই সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া । আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড.শাহাদীন মালিক এ প্রসংগে বলেন ,

“সংবিধান অনুযায়ী দুভাবে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। প্রথমত, নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা না থাকলে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত হওয়ার পর অযোগ্য হলে। হলফনামায় সঠিক তথ্য দেয়া একটি যোগ্যতাÑ যেমন প্রার্থী ঋণখেলাপি নয়, সেটা প্রমাণ করা। হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়া হলে সেটা অবশ্যই অযোগ্যতা। তিনি আরো বলেন, এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন সংসদ সদস্য তাহার নির্বাচনের পর সংবিধান বর্ণিত অযোগ্যতার অধীন হয়েছেন কিনা কিংবা এই সংবিধানের অনুসারে কোন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হইবে কিনা, সে সম্পর্কে কোন বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হইবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে।”

অথচ ফলাফল কি হলো ? ফলাফল হলো, স্পীকারের কাছে খামাখাই চিঠি চালা –চালি,তারপর স্পীকার “আমার এখতিয়ারে নেই”,বলে আরেক নাটক করলেন, এবং অতঃপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বল্লেন,”সাকা ইজ এ ডেড ইস্যু নাউ”।

বলিহারি আপনার সাহস জনাব সি ই সি । তারিফ করি , তালি দেই সজোরে । শুনেছিলাম আপনার নাকি বেজায় সাহস । আপনি মন্দকে মন্দ বলেন, কারো পরোয়া করেন না । অথচ দেখেন, নীতির প্রশ্ন তুললে আপনার পরাজয় আর কেউ ঠেকিয়ে রাখা গেলো না । আপনার বোঝা উচিত ছিলো, এই সরকার ডিজিটাল সরকার । কল কব্জার বড় ভয় তাদের । যদি নষ্ট হয়ে যায় । আপনি কোন কিংবা কার ইশারাতে এগিয়েছিলেন জানিনা জনাব । শুধু এইটুকু বলি, আপনি হেরে গেছেন একটি পশুর কাছে । আপনার মুখ দিয়েই বের হয়েছে, “ইটস আ ডেড ইস্যু”

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কি মনে পড়ে তত্বাবাধায়ক হরিণ ধর-পাকড়ের কথা ? আমাদের নেতা নেত্রীরা আবার পশু পাখির খুব সমঝদর । দেশ পোষে সাকা । আর সাকা,হারিস,ফালু’রা পোষে হরিণ । চিত্রল-দীঘল,মায়া ইত্যাদি । ততকালীন ধর-পাকড় শাষনামলে এই খবরটি আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলেছিলো,

যৌথবাহিনীর ভয়ে সাকার হরিণ বনে ছেড়ে দিয়েছে কর্মচারীরাঃ সামপ্রতিক যৌথবাহিনীর অভিযানে মোসাদ্দেক আলী ফালু ও হারিছ চৌধুরীর বাড়ি থেকে হরিণ উদ্ধারের পর রাঙ্গুনিয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপি দলীয় সাবেক সাংসদ সাকা চৌধুরীর খামারবাড়িতে বন্দী ১৬টি চিত্রা হরিণকে কর্মচারীরা যৌথবাহিনীর ভয়ে গতকাল শনিবার পাশর্্ববর্তী পাহাড়ে ছেড়ে দিয়েছে৷ এক সময়ের প্রবল পরাক্রমশালী রাঙ্গুনিয়ার সাবেক এমপি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর (সাকা চৌধুরী) রাঙ্গুনিয়া গোডাউন এলাকায় শত কোটি টাকা মূল্যের ৪০ একর ভূমি দখল করে নির্মিত বিশাল খামারবাড়িটি এখন নীরব নিথর একটি ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে৷ এক সময় যে খামার বাড়িতে শত শত নেতাকর্মী ও ক্যাডারের নিত্য যাতায়াত ও অবস্থান ছিল সেই খামারবাড়িতে এখন অনেক খুঁজেও কোনো লোক পাওয়া যায় না৷
পার্শ্ববর্তী রাউজানের সন্তান সাকা চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ায় এসে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে তার বিরুদ্ধে বহিরাগত অপবাদ ওঠে ৷ সেই অপবাদ ঘোচাতেই সাকা চৌধুরী ১৯৯০ সালে রাঙ্গুনিয়া গোডাউন এলাকায় বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানির (বিটিসি) কাছ থেকে মাত্র ২ একর জায়গা কিনে এই জায়গার আশপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রায় ৪০ একর পাহাড় ও ভূমি দখল করে নেন ৷অবৈধভাবে দখলকৃত এই পাহাড় ও ভূমিতে ‘কাদের নগর’ নাম দিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল খামারবাড়ি ৷ এই খামার বাড়িতে বিলাসবহুল কটেজ, বৈঠকখানা, চিড়িয়াখানা, পুকুর-দিঘি, গবাদিপশুর খামারসহ অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেন ৷ এই খামারবাড়িটি নির্মিত হওয়ার পর থেকেই রাঙ্গুনিয়ায় সাকা চৌধুরীর সকল ধরনের রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, সন্ত্রাসী ও ক্যাডার লালন এবং অস্ত্রের মজুদসহ সকল অনৈতিক কাজ পরিচালিত হতো এখান থেকেই ৷জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ার কোদালা ইউনিয়নের পূর্বকোদালা গ্রামের মোঃ আবদুল্লাহ ও তার অপর ৩ ভাইয়ের বিশাল ভূসম্পত্তি দখল করেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার এই খামারবাড়িটি নির্মাণ করেন৷ জমির প্রকৃত মালিকদের উত্তরাধিকারী কোদালা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাইয়ুম জানান, সাকা চৌধুরী রাজনৈতিক প্রভাব ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে মাত্র ২ একর জায়গা কিনে আশপাশের ৪০ একর জায়গা দখল করে কাদের নগর নাম দিয়ে এই খামারবাড়ি নির্মাণ করেছেন৷ তিনি আরো জানান, সাকা চৌধুরীর এই অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ও জমি উদ্ধার করতে তিনি শিগগিরই আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করবেন ৷ কয়েকদিন পূর্বে দুদকে দাখিল করা সাকা চৌধুরী সম্পত্তির হিসাবে রাঙ্গুনিয়ায় খামারবাড়ির পরিমাণ ৩.৩ একর বলে দেখালেও এখানে তার দখলে থাকা মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ৪০ একর ৷ যার বাজারমূল্য কমপক্ষে একশ কোটি টাকা ৷

গতকাল সরজমিন সাকা চৌধুরীর খামারবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নীরব নিথর ভুতুড়ে অবস্থা বিরাজ করছে ৷ কাদের নগরের মূল গেট থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত সাকা চৌধুরীর বৈঠকখানাটি এখন জনশূন্য ৷ মূল কটেজ ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন আনোয়ার নামের একজন দারোয়ান ৷ তিনি জানান, সাকা চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পর এখানে সচরাচর কেউ আসেন না ৷ দারোয়ান আনোয়ারসহ সেখানে উপস্থিত কয়েকজন কর্মচারী জানান, খামারবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করার পর থেকেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এখানে চিত্রা হরিণ পুষতেন ৷ সম্প্রতি হারিছ চৌধুরী ও মোসাদ্দেক আলী ফালুর বাড়ি থেকে হরিণ উদ্ধারের পর সর্বশেষ গতকাল সকালে সাকা চৌধুরীর খামারবাড়ি থেকে ১৬টি বন্দী হরিণ আশপাশের পাহাড়ে ছেড়ে দেওয়া হয় ৷ এই খামারবাড়িতে হরিণ বন্দী থাকা ও ছেড়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন সাকা চৌধুরীর খামারবাড়ির দারোয়ান আনোয়ার ও কর্মচারী কবির ৷ খামারবাড়িতে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে অজ্ঞাত স্থান থেকে দ্রুত ছুটে আসেন খামারবাড়ির কেয়ারটেকার আবছার (৫৫)৷ তিনি দ্রুত সাংবাদিকদের খামারবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, সাকা চৌধুরীর গ্রেপ্তারের পর এখানে কাউকে প্রবেশ করতে না দিতে ওপরের নির্দেশ রয়েছে ৷”

এছাড়াও , পাঠক আপনাদের কি মনে আছে, কেয়ারটেকার সরকারের আমলে সাকার বাড়ি থেকে অবৈধ গাড়ি আর ২৯শে মে ২০০১ এ সাকার বাড়ি থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ? না জেনে থাকলে নীচের খবরটুকু পড়ুন-

“যৌথবাহিনীর সদস্যরা গত শনিবার গভীর রাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা, দুর্নীতি দমন কমিশনের তালিকাভুক্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ৩ গাড়ি জব্দ করেছে ৷ ধানমণ্ডির ১০/এ সড়কের ৪৮ নম্বর সাকা চৌধুরীর বাসায় অভিযান চালানোর সময় যৌথবাহিনীর সদস্যরা বিএমডবি্লউ ল্যান্ড, ক্রুজার, লেন্সার এবং নিশান পেট্রোলসহ ৬ টি গাড়ির সন্ধান পায়৷ এর মধ্যে ৩ টি গাড়ির কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় এ ৩ টি গাড়ি জব্দ করা হয়৷বিলাসবহুল এ গাড়ির ২টি জিপ (ঢাকা মেট্রো-১১-০০৯০ এবং চট্ট মেট্রো ০২-০০১০), আরেকটি লেটেস্ট মডেলের লেক্সাস কার (ঢাকা মেট্রো-১৪-০০৯৬) জব্দ করার পর গাড়িগুলো নিয়ে যাওয়া হয় ধানমণ্ডি থানায়”

ওই থানা পর্যন্তই । আমরা অবশ্য জানিনা এরপর কি হয়েছে । মামলা হলো কি না, হলেও কি মামলা হলো, কত ধারায়,মামলার বর্তমান অবস্থা , কিছুই জানিনা । শুধু অনুমান করে নিতে পারি, বহাল তবিয়তে গাড়ি গুলো ১০/এ এর বাসায় ফেরত এসেছে । থানার ওসি,পুলিশ কমিশনার এসে দুঃখিত, দুঃখিত বলে প্যান্ট নষ্ট করে ফেলেছে ।এর চেয়ে বেশী আর কিইবা অনুমান করা যায় ? কিইবা হতে পারে এর ভবিষ্যত, বুদ্ধিমান পাঠক মাত্রই বুঝে নেন ।

নিটোল কে মনে আছে আপনাদের ? চট্রগ্রাম ছাত্রদলের সভাপতি শহীদুল আলম নিটোল । আলম, বখতিয়ার,জসিম,সেলিম প্রমুখ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সাথে যার এক হয়ে সাকার পক্ষে কাজ করবার কথা ছিলো । শুধু সে কথা রাখতে পারেনি নিটোল । তাই ২০০১ এর ২৯শে মে সাকা’র বাড়ির সামনেই খুন হয়ে যেতে হলো এই তরুন ছাত্রদল নেতাকে । কি হয়েছিলো সেই মামলার ? মামলা নাম্বার-৮৭-২৯/৫/২০০১ ।সে রাতেই সাকার বাড়ি থেকে উদ্ধার হলো অবৈধ দুইটি টেলিস্কোপ রাইফেল,দুইটি এয়ার গান,একটি রিভলবার, একটি পিস্তল,১৭৩ রাউন্ড রাইফেলের গুলি, ২৫০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি । সে রাতেই সাকার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা হলো । সে শুধু মামলা পর্যন্তই । ২০০২ সালের ৪ নভেম্বর নিটোল হত্যা মামলা থেকে অতি নিরবে ও নিভৃতে নাম উঠিয়ে নেয়া হয় মামলাটির অন্যতম প্রধান আসামী সাকা আর তার ভাই গিয়াসুদ্দিনকে । বিচারের বাণী শুধু নাকের আর চোখের পানি এক করেই মরল । কারো কিছুই হলো না ।

কি হলো ২০০৮ এ ২৬ এ অক্টোবরে সাকার বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭২২ টাকার সম্পদের হিসাব গোপন ও এর ওপর প্রযোজ্য আয়কর দাবির অভিযোগে দায়ের করা মামলাটির ? সাকাকে সে সময় পলাতক দেখানো হয়েছিলো । (বিচারক মোঃ আজিজুল হক সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে পলাতক দেখিয়ে সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের আদেশ দিয়ে আগামী ৪ নভেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন। ২৬ অক্টোবর মামলাটি দায়ের করেছিলেন এনবিআরের উপ-করকমিশনার ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন ) । সে মামলা এখন কই কিংবা কিই বা অবস্থা ? পলাতক আসামী এখন কি করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাঠ-ঘাট ? এ এক সব সম্ভবের দেশই বটে । অবশ্য মামলা করেও বা কি লাভ । মওদুদ সাহেবের মামলা গুলোর যেভাবে শেয়ার বাজারের মতন পতন হচ্ছে , তাতে করে কি আর হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক সাকার ৩ কোটির মামলা ধোপে টিকে ? একটি খবরে তখন বলা হয়েছিলো,

“সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় গতকাল তাঁর প্রতিষ্ঠান কিউসি শিপিং লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক রতন মানিক রায় এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক আব্দুল খালেক সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ দুজনকে নিয়ে এই মামলায় মোট ৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।দুদকের আইনজীবী শেখ গোলাম হাফিজ জানান, সাক্ষী রতন মানিক রায়ের সাক্ষ্যে কয়েকটি ব্যাপার বেরিয়ে এসেছে। তিনি আদালতে বলেন, ১৯৯৮ সালের ২৫ জুন একটি হলফনামা করা হয়েছে। এই হলফনামায় ফজলুল কাদের চৌধুরী, ফারজিন কাদের চৌধুরী ও হুমাম কাদের চৌধুরী তাঁদের বাবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ছয় কোটি ৮৪ লাখ টাকা দান করেছেন বলে উল্লেখ আছে এবং এতে তাঁদের সই রয়েছে। কিন্তু কোনো দান সাক্ষীর উপস্থিতিতে হয়নি এবং দাতা হিসেবে সাকা চৌধুরীর তিন সন্তান তাঁর উপস্থিতিতে সই করেননি বলে তিনি আদালতকে বলেন।”

এছাড়াও জঙ্গেএ সংঘটন গুলোকে উষ্কে দেয়া এবং দেশকে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায় । আনন্দবাজার পত্রিকা গত বছর ২২শে আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে,

“ভারত বিরোধি প্রচারের আচ উস্কে দিতে এবার অন্য দেশে নিজস্ব টিভি চ্যানেল তৈরীর কাজ শুরু করেছে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। বাংলাদেশে একাধিক টিভি চ্যানেলের জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে পাকিস্তান এবং দুবাই থেকে। ভারত সরকারের শীর্ষ সুত্রে এই খবর জানা গেছে। ঢাকায় আপাতত একটি টেলিভিশন চ্যানেলের পরিকল্পনা চুড়ান্ত হয়ে গেছে । অপেক্ষমান আরো বেশ কয়েকটা । জংগি সন্ত্রাস বৃব্ধি ও কাশ্মীর উপত্যকা অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠার পরিপেক্ষিতে এই তথ্য নিঃসন্দেহে নয়াদিল্লির রক্তচাপ বাড়িয়েছে । সন্ত্রাসবাদ এবং আইএসআই এর উপর পাক সরকারের শিথিল নিয়ন্ত্রন প্রসংগে কলোম্বোর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে পাক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন মনমোহন সিঙ্ঘ । কথা হয়েছে বাংলাদেশের তদারকী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদের সংগেও । ঢাকায় আইএসআই এর সক্রিয়তা নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন মাধ্যমে বাংলাদেশকে সতর্ক করেছে ভারত । বাংলাদেশের প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী ২০০৬সালে ক্রোনো স্যাটালাইট ব্রডকাষ্ট(সিএসবি)নামে একটি সংবাদ চ্যানেল চালু করেছিল।ধর্মীয় উগ্র মৌলবাদের প্রচার করতো চ্যানেলটি।পরে তদারকি সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৭সালের সেপ্টেম্বর মাসে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়।দুর্নীতির দায়ে সাকা চৌধুরী এখন জেলে হাজতে। এ মাসের ২৮তারিখেই ঢাকা থেকে একটি নতুন টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার শুরু হচ্ছে।একই পরিচালকদের একটি বাংলা দৈনিকের ভুমিকাই বলে দেয় সিএসবি-র কাজকে এগিয়ে নিয়া যাওয়াই হবে নতুন চ্যানেলটির উদ্দেশ্য।সেই ইংগিত পেয়েই চ্যানেলটির লগ্নিকারীদের সম্পর্কে খোজখবর শুরু করে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশের গোয়েন্দা বিভাগ।যেমন,লগ্নিকারীদের একজনের বিরুব্ধে ২০০৬সালে ব্রিটেনে হেরোইন প্রাচারের অভিযোগ এনেছিল বাংলাদেশ পুলিশ।বিএনপি-জোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অভিযুক্তের তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেয়া হয়।আরেক লগ্নিকারী আবার দাউদ ইব্রাহিমের ঘনিষ্ট হিসাবে পরিচিত। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন,চ্যানেলটির মালিকানার সংগে জামায়াতে ইসলামীর কিছু কেন্দ্রীয় নেতা যেমন যুক্ত,তেমন একটি বিতর্কিত ইসলামী ব্যাংকেরও যোগাযোগ রয়েছে।এই ব্যাংকের মাধ্যমেই জংগি সংগঠন হুজি-র কাছে বিপুল বিদেশি অর্থ এসেছিল বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে ধরা পড়েছিল।ব্যাংকটিকে এর জন্য জরিমানাও গুনতে হয়। চ্যানেলটির উদ্ভোধনী অনুষ্টানে প্রধান অতিথি হিসাবে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ থাকার কথা থাকলেও তিনি যাচ্ছেন না বলে পরিচালকদের জানিয়ে দিয়েছেন।বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের এক সুত্র জানিয়েছেন,লগ্নিকারীদের সম্পর্কে বিরুপ গোয়েন্দা রিপোটের পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্ক এড়াতেই রাষ্ট্রপতি অনুষ্টানে না থাকার সিব্ধান্ত নিয়েছেন।গোয়েন্দা দফতরের কর্তা জানিয়েছেন,বিএনপি আমলের শেষ দিকে তরিঘড়ি করে যে দুটি চ্যানেল কে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছিল এটি তার অন্যতম।অপরটি ছিল সাকা চৌধুরীর সিএসবি।মালিকদের সম্পর্কে আপত্তিকর তথ্য মেলার পরে এই চ্যানেলটিতে বিনিয়োগ হওয়া অর্থের উৎস সম্পর্কে খোজ খবর করার জন্য গোয়েন্দাদের নির্দেশ দিয়েছে তদারকি সরকার”।

পাঠকদের এই মূহুর্তে একটি তথ্য না দিলেই নয় যে, এই সি এস বি’র পরিচালক ছিলো । সাকার পূত্র হুম্মাম কাদের চৌধুরী কোকো ওরফে হুকাচৌ । অত্যন্ত উগ্র ও বদ্মেজাজী এই হুম্মামের এইবার রাউজান থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবার কথা ছিলো । সাকা নির্বাচন করতে না পারলে হুকাচৌই হতো সাকার উত্তরসূরী ।প্রতি সপ্তাহে নতুন নারী,জুয়াখোর এই হুম্মামরা আমাদের দেশের হাল ধরবে এইতো আমাদের নিয়তি ।
ব্যাবসায়ী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আঊয়াল মিন্টু,তাফসির আঊয়াল মিন্টু এবং সঞ্জয় সাল্ধানা’র হোস্ট করা রাতের অভিসারে লক্ষ টাকা উড়িয়ে দেবার গল্প আর সে রাতে হয়ে সংঘর্ষের গল্পটি এই লিঙ্ক থেকে আগ্রহী পাঠকরা জেনে নিন ।

আমার আসলে এসব পড়ে হতাশ লাগে না । সাকা,আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ছেলেরা এক রাতে লক্ষাধিক টাকা ঊড়াবে, নারী নিয়ে ফূর্তি করবে, মাতাল হয়ে কদর্য মারামারি করবে আর তার ঠিক পাশে কমলাপুরে রেল স্টেশনে হাজার হাজার ছেলে-মেয়েরা দিনের পর দিন অভুক্ত থাকবে , আমার কাছে আজকাল এটাই স্বাভাবিক মনে হয় ।

সে যাক । আমি হয়ত অফ ট্র্যাকে চলে যাচ্ছি । সাকাকে নিয়ে বলছিলাম । বলছিলাম তার খুনের মামলার সাথে জড়িত থাকবার কথা, চোরাচালানীর,আয়কর ফাঁকি’র মামলা,তার বাসা থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কথা,বিডিয়ার হত্যজজ্ঞ এবং জংগী নেটোয়ার্কে জড়িত থাকবার কথা ।
এখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, সাকার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ আসবার পরও কেন প্রতিটি সরকার ঝিম মেরে থাকে ? কি তার এত ক্ষমতা ? বিভিন্ন তথ্য,মানুষ জনের সাথে কথা বলে,ইন্টারনেট,সাকার পরিবারের ঘনিষ্ট কিছু লোক যারা এককালে সাকা পরিবারের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ট ছিলো এইরকম কিছু মানুষ থেকে আসলে ঘুরে ফিরে একই তথ্য পাই । সে তথ্য গুলো যদি গুছিয়ে লিখি তাহলে বলতে হয় সে পুরোনো কথাই । রাজনৈতিক ভাবে তার বাবা একটা অবস্থান তৈরী করে দিয়েছিলো সেই ব্রিটিশ পর্বের পর থেকেই । দাদা বৃটিশদের পা চাটা কুকুর ছিলো বলে ধন-সম্পদের দিকে আর ফিরে তাকাতে হয় নি । সুতরাং সে সময় থেকেই সাকা পরিবার আশে পাশের মানুষদের দেখত তাদের অনেক নিম্ন জাতের ও প্রজা হিসেবে । যা আজ পর্যন্ত দেখে আসছে । রাউজান,ফটিকছড়ি,গহিরা,রাঙ্গুনিয়াতে সাকার আছে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সন্ত্রাসী বাহিনী । যারা অত্যাধুনিক সব অস্ত্রে সজ্জিত । সাকার এলাকা থেকেই তার দলীয় এক সন্ত্রাসী কালা খলিল ১৯৯৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশে প্রথম উজি অটোমেটিক মেশিন গান নিয়ে ধরা পড়ে । যা বাংলাদেশ আর্মিতেও বিরল । সাকার আছে চৌকশ একটি গোয়েন্দা বিভাগ । যারা সাকাকে তার সমগ্র এলাকার খবরাখবর হাতের মুঠোয় এনে দেয় ।এই বিভাগের এক সময়ে প্রধানের নাম ছিলো বখতিয়ার । যা একটি অসমর্থিত সূত্র থেকে জানতে পাই । ঐ সূত্র থেকে আরো যা জানতে পারি,

“সালাউদ্দিন কাদের ও গিয়াসউদ্দিন কাদের- দু’ভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় দীর্ঘদিন ধরে রাঙ্গুনিয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সংঘটিত হয়ে আসছে। তবে রাঙ্গুনিয়া সন্ত্রাসের জনপদ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে মূলত ১৯৯৬ সালে সাকা চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর। তখন থেকেই সাকার পৃষ্ঠপোষকতায় রাঙ্গুনিয়ায় একের পর এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে ওঠে। কোটর থেকে চোখ উপড়ে ফেলা, কথায় কথায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলেপড়া, যত্রতত্র চাঁদাবাজির মতো সন্ত্রাসী তান্ডব চালাতে থাকে সালাউদ্দিনের অনুগত ক্যাডাররা। রাঙ্গুনিয়ার আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীবাহিনী হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, জমিদখল, অপহরণসহ যাবতীয় অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে থাকে। হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, জবরদখলসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হতে থাকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সমর্থিত রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরাও। এদের মধ্যে উত্তর রাজানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্বাস উদ্দিন, পোমরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন, পারুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম, হোছানাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মীর্জা নাজিম উদ্দিন খোকন, সরফভাটার চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন, ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নেছারুল হক পেয়ারু, লালানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদার, মরিয়মনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন উলেস্নখযোগ্য।

২০০২ সালের ১২ মার্চ ব্রহ্মোত্তর গ্রামের ফজল সওদাগরের ডান চোখ কোটর থেকে উপড়ে ফেলে সাকার ক্যাডাররা। সাকা ক্যাডারদের হাতে মারধর ও চাঁদাবাজির শিকার হন চন্দ্রঘোনার বাসিন্দা হাজি রাজা মিয়া, বেতাগী ইউনিয়নের বাসিন্দা রফিক আহামদ তালুকদার, লালানগরের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমসহ অসংখ্য মানুষ। ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাউজান-রাঙ্গুনিয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার ক্যাডারদের বিরুদ্ধে সাতটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে। বাকি দুটো মামলার তদন্ত চলছে। দীর্ঘদিন মুখ খুলতে না পারা রাঙ্গুনিয়ার ভুক্তভোগী জনগণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উৎসাহে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার ক্যাডারদের বিরুদ্ধে এসব মামলা করে”

আর সাকার নির্বাচনী এলাকার হিন্দু অধ্যুষ্যিত অঞ্চল গুলোতে সাকার নাম শুনিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের ঘুমপাড়ানো হয় । হিন্দুদের মাঝে এতটাই আতংক এই সাকা নামের পশুটির । গত পর্বের লেখাতে একজন ‘ব্লুজ’ নামে একজন আমার ব্লগের একজন ব্লগার মন্তব্য করেছেন একটি তথ্য দিয়ে । তথ্যটি এমন,

“চট্টগ্রামে থাকার সুবাধে এর কিছু কিছু জানতাম তবে অনেক নতুন কিছু জানলাম। এলাকায় ভোটের আগে সাকা হিন্দুদের বাড়ী যেত আর জিজ্ঞাসা করত তারা তাকে ভালবাসে কিনা । তখন সবাই ভয়ে বলত “হ্যাঁ” । সাকা বলত আমি জানি আপনারা আমাকে ভালবাসেন, তাই ভোটের দিন আপনাদের ভোট কেন্দ্রে আর যাওয়ার দরকার নাই। আমি আপনাদের ভোট পাইয়া গেছি ।হিন্দুরা তার ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যাইতনা”

আমি ঠিক একই ধরনের তথ্য আরো কয়েকজন চট্রগ্রামবাসীর কাছ থেকে পেয়েছি । এসব কিছু এবং আগের পর্বগুলোর একটা সার সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় এমন-

ক)চট্রগ্রামভিত্তিক সাকার রাজনৈতিক প্রভাব
খ)অর্থনৈতিক ভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী । (একটি গোপন ও শক্তিশালী সূত্র মতে সাকা শুধু তার সম্পত্তি বাদ দিয়েই শুধু নগদ হিসেবে, প্রায় পনেরো হাজার কোটি টাকার মালিক ।)
গ) পাকিস্তানের রাজনৈতিকদল ও উগ্র জংগী দল গুলোর সাথে টপ কানেকশন
ঘ)মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক শক্তিশালী নেটোয়ার্ক
ঙ)চোরাচালানী ও মোস্ট ওয়ান্টেড দাউদ ইব্রাহীম এবং ইম্রান খোয়াদ্দাদের সাথে ব্যাবসায়িক সম্পর্ক

এসব ছাড়াও ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা’র সাথে সাকার ঘনিষ্ট সম্পর্ক, কারো কারো মতে সাকা নিভৃতে মার্কিন মদদ পুষ্ট । তাকে শো করাই হয় মার্কিন বিরোধী হিসেবে , পলিসি রিজনের কারনে ( যদিও এই তথ্যটি নিয়ে আমার নিজেরও কিছু দ্বিমত রয়েছে )। এছাড়াও অন্যান্য নিয়ামক হিসেবে যেসব কারন তার ক্ষমতার ক্ষেত্রে একটু হলেও নিয়ামক হিসেবে বলা যায় তা হলো, চট্রগ্রামের মেয়র মহিউদ্দীনের সাথে সাকা’র আত্মীয়তার সম্পর্ক, শেখ পরিবারের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক এবং খালেদা জিয়ার প্রিয়ভাজন ।

চল্বে… (পরের পর্বে সমাপ্ত)

“সাকা” একটি পশুর নাম (পর্ব-৪)

images

এইমাত্র সারাটা দিন শেষে লেখা হলো ৪র্থ পর্ব । এমনিতেই রোজা রেখে ক্লান্ত তার উপর এই পশুকে নিয়ে সারাদিন এই বিস্তর গবেষনা । কথা দিয়েছি বলেই লিখছি তা সম্ভবত না । নিজের ভেতর থেকে একটা তাগিদ সারাদিন বুকে চেপে থাকে । মনে হয় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আমার মত হাজারো নিরীহ মানুষ হাহাকার করে , দীর্ঘশ্বাস ফেলে । পর্ব লেখার আগে পড়েছিলাম সাকার ছেলে সি এস বি নিউজের প্রাক্তন পরিচালক হুম্মাম কাদের চৌধুরী কোকো ওরফে হুকাচৌএর কথা । পড়েছিলাম তাদের রাত্রি যাপন আর এক রাতে লক্ষ,লক্ষ টাকা উড়িয়ে দেবার কাহিনী । পড়তে পড়তে কখন যে হাতে মুঠো বার বার শক্ত হয়ে যাচ্ছিলো কি এক প্রবল ক্ষোভে আর কষ্টে, তা বোঝাবার নয় । দেশ থেকে শুভাকাংখীরা ফোন করে এই লেখাটি বন্ধ করবার অনুরোধ জানায়, ব্যাক্তিগত মেইলে কত মানুষ প্রতিদিন জানায় বিভিন্ন মতামত আর তাদের ইচ্ছের কথা , বলে শেষ করতে পারবো না । ব্লগে , আড্ডায় আমাকে সতর্ক করে দেয়া হয় আমাকে ভালোবাসে বলেই । ফেইস বুকে অচেনা একজন মেসেজ দেয়, “ ভাই চালাইয়া যান,আছি” । আমি সজোরে “চালাইয়া যাই” । জানি আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে । আহত হতে হতে, ধর্ষিত হতে হতে এখন আর কোন আঘাত আর আঘাত মনে হয় না । জানি, আমার মত কোন ভীতু পাবলিক ঊঠে দাড়াবেই । একদিন গলার রগ-টগ ফুলিয়ে তীব্র হুঙ্কার দিয়ে, আর এই সব পশুদের সরিয়ে দিয়ে বলবেই,
“বাইনচোদ সর । এইবার আমাগো পালা”

আমি সেই আশাতেই বসে থাকি , নিরন্তর ।

***************************************************************************************************

৩য় পর্বের পর—-

রাউজানে নুতন চন্দ্র সিংহ ছাড়াও, আব্দুল মান্নান,পঙ্কজ বড়ুয়া,জাফর আলম চৌধুরী,বিকাশ বড়ুয়া,শামসুল আলম,মুসা খান,শফিকুল আলম,,রুহুল আমিন,সবেদার আবুল কাশেম,সুবেদার বাদশা মিয়া,সুবেদার নূরুল আমিন,সুবেদার আবুল বশর ও এজাহার মিয়া ছিলো সাকা ও ফকার শিকার । ১৯৭১ সালেই পশু সাকা ও ফকার নেতৃত্বে তাদের হত্যা করা হয় ।সাকা চৌধুরীসহ চট্টগ্রামে অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের মামলাগুলোর পুনঃতদন্তের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে সিআইডির তৎকালীন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাদের খান মামলার তদন্তকাজ চালাতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে আর অগ্রসর হতে পারেননি। চট্রগ্রাম আদালতের রেকর্ডরুমে এ সংক্রান্ত নথিপত্রের খোঁজ করতে গিয়ে জানা গেছে, এসব মামলার নথিপত্রের আর কোনো হদিস নেই ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে রাউজান থানাতেই ফকা চৌধুরী ও তার ছেলে সাকা চৌধুরীসহ অন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৬টি মামলা হয়েছিল। মামলাগুলোর নম্বর হলো ৪১(১)৭২, ৪(৩)৭২, ৯(৩)৭২, ১৮(৪)৭২, ৪(৪)৭২ ও ৫(৪)৭২। এসব মামলার তদন্ত শেষে ফকা চৌধুরী ও সাকা চৌধুরীসহ অন্যদেরকে আসামি করে চার্জশিটও দেওয়া হয়। কিন্তু,পরবর্তী সময়ে এসব মামলার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করে (পিটিশন নং-৩৬৫/৭৩) তা স্থানান্তর করা হয় সাকা চৌধুরীদের পক্ষ থেকে । এরপর থেকে এ সব মামলার আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই একবার মামলা বন্ধ হলে তা আবার চালু করা সে পুরোনো উদ্যমে,বেশ মুশকিল । আমার বাবা একজন আইনজীবি হবার সুবাদে অনেক বার এই চিত্র দেখেই আমাকে বড় হতে হয়েছে । সুতরাং সত্যরঞ্জন সিংহএর মৃত্যূর পর এই মামলা যে মুখ থুবড়ে পড়বে তা আমাদের মত দেশের দৃষ্টিকোন থেকে বলাই বাহুল্য ।সবচাইতে বড় ব্যাপার হলো, যেখানে বি এন পি আমলেই সাকার’র বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এক ডজনের বেশী ( ২৩-২-৯১, ধারা ১৪৭,১৪৮,১৪৯,৪২৭,৪৩৫ ও ৩০২ দন্ডবিধি, মামলা নং- ৭(৯)৯১ ধারা ১৪৩,৪৩৫,৪২৭, ৩০৭ দন্ডবিধি মামলা নং ২২(০৩-০৩-৯১) ধারা ৩৬৪/৩২৩/১১৪ দন্ডবিধি ) তার উপর প্রাথমিক অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার চার্জশীট( নম্বর ৬৪, তাং-৮-৬-৯১,চার্জশীট ৫৫(১৯-৫-৯১) চার্জশীট ৮৮ (৩১-৭-৯১) দাখিল করা সত্বেও সাকাকে আইন –আদালত তাকে কিছু করতে পারেনি, সেখানে অনেক আগের মুক্তিযোদ্ধা হত্যার অভিযোগ কি আর ঠাই পাবে ? নূতন বাবুর আরেক ছেলে আর পি সিংহ এই মামলা চালাতে গিয়ে ঘর হারিয়েছেন, সম্ভ্রম হারিয়েছেন,অপমানিত হয়েছেন,সাকার ক্যাডার রাশেদ,খোরশেদ,বখতিয়ার,নিটোল ( পরবর্তীকালে সাকার ক্যাডারদের হাতেই নিহত) জসিমদের হাতে পড়েছেন, ছেলে মেয়ে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন । কেননা,আমাদের এই দেশে সাকার মত পশুরা , নিজামী,সাঈদী,গো আজম ,মুজাহিদ এদের মত লোকরাই রাজত্ব করবে এইটাই মূল কথা । যাই হোক প্রসঙ্গে ফিরি ।

আমি আগের লেখা গুলোতে আপনাদের একটা ধারনা দেবার চেষ্টা করেছি যে, চট্রগ্রামের রাউজান,গহিরা,রাঙ্গুনিয়া,ফটিকছড়ি এই এলাকাগুলো মূলত ফজলুল কাদেরের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলো তার রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক শক্ত অবস্থানের কারনেই । যদিও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এসে এই পশু পরিবারটিকে প্রথমবারের মত এক তীব্র সংকটে পড়তে হয় । ১৯৭১ সালে সরাসরি বাংলাদেশের বিরোধিতা করে পাকি পুচ্ছ লেহনের কারণবশত খুব স্বাভাবিক ভাবেই সে সময়টা মুক্তিযোদ্ধাদের রোষানলে পড়ে ফজলুল কাদের আর তার চার পূত্র সালাউদ্দিন কাদের জামালুদ্দিন কাদের,সাইফুদ্দিন কাদের এবং গিয়াসুদ্দিন কাদের চৌধুরী । এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, ওই সময়ে আমাদের আরেক কথিত “চট্রগ্রাম দরদী” ও “কথিত” মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমানে চট্রগ্রামের মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন ( মহিউদ্দিন হচ্ছে সাকার চাচাত ভাই ) এই পশু পরিবারটিকে পেছন থেকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করে গেছে তাদের কে বাঁচাবার জন্য । যদিও সাকাচৌ তার চিরাচরিত স্বভাবের কারনে মহিউদ্দিনের পুচ্ছদেশে সময়মত পলেস্তরা খসিয়ে দিয়েছে । “মেয়র হজ্জ্ব কাফেলা”খ্যাত দূর্নীতিবাজ এই মেয়র যখন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দেয় , তখন স্বভাবতই অবাক হতে হয় তার এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড দেখে । অবশ্য অবাক হবার কিছুই নেই যেখানে তার ছেলে মহিবুল হাসান নওফেল আমাকে গত ১৭ই মে একজন মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পেইনের মিটিং শেষ করে টিউবে করে ফিরবার সময় বেশ গর্ব করে বলে,

“আমার বাবা দূর্নীতি করে না, কিন্তু তিনি অনেক কেই ধনী বানিয়ে দিয়েছে । এস আলম কে ৭০০ কোটি টাকা লোন স্যঙ্কশন করিয়ে দিয়েছে আমার বাবা” । সে সময় আর কি বলার থাকতে পারে ?

এরপর যার কথা আসে, তার কথা শুনে মনে হবে মহিউদ্দিন আবার কোন ছার ! আর কেউ নন , তিনি হচ্ছেন আমাদের জাতির জনক বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । ১৯৪৭ এর আগের সেই কলকাতা ভিত্তিক বন্ধুত্ব শেখ মুজিব ঝেরে ফেলতে পারেন নি । অভিবক্ত পাকিস্তান আমল থেকেই ফজলুল কাদেরের সাথে বংগবন্ধুর একটি অন্তরঙ পারিবারিক সম্পর্ক ছিলো । মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হবার সুবাদে রাজনৈতিক ভাবেই শেখ মুজিবের সাথে ফকা আর তার পরিবারের একটি অতি ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে । আর একই বয়সী শেখ কামালের সাথে সাকার বেশ ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো । এখানে একটি তথ্য দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি যে, আমাদের এখনকার ডিজিটাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে পশু সালাউদ্দিন কাদেরের বিয়ের কথাবার্তা অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছিলো (মুক্তিযুদ্ধের আগে বংগবন্ধু সম্ভবত পশু চিনতে ভুল করেছিলেন ) এবং সেটা বংবন্ধুর আগ্রহেই ।

যা পরবর্তীতে সাকা চৌ সাংবাদিকদের সামনে নিজেই স্বীকার করে তার পশুর মত ঠোট দুইটি নাড়িয়ে ব্যাংগ করে বলেছিলো,

“ হাসিনা তো আমাকে নিয়ে বলবেই । কেননা উনি আবার আমার প্রতি একটু দু”ব্ব”ল…আমাদের বিয়ে হবার কথা ছিলো কি না… ওয়াযেদ মিয়ার সাথে উনার বাসর রাতের শাড়ি আমারই কিনে দেয়া”

পরবর্তীতে অবশ্য এই উক্তির বিরুদ্ধে কোন আইনআনুগ ব্যাবস্থা নেয়া হয়নি ,(কিন্তু আমরা সাধারণ পাবলিক যদি এই কথা বলতাম, তাহলে আমাদের চৌদ্দগুশটি হয়তবা উদ্ধার হয়ে যেত) মানহানির মামলা করা হয়নি যা থেকে মৌনতাই সম্মতির লক্ষন বলে আমরা সাধারণ জনগণ বুঝে নিতে পারি ।

১৯৭১ সালের ১৮ ই ডিসেম্বর যখন ফকা জাঙ্গিয়া পরা অবস্থায় ধরা পড়ল সে সময় বংগবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী । সুতরাং তিনি এসে ফকাকে বাঁচাবেন কিংবা তার পরিবারকে একটা “অবস্থানে” পৌছাবেন সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার কোন সুযোগ ছিলো না । বরং ১৯৭২ সালের ১০শে জানুয়ারীতে বংগবন্ধু যখন দেশে আসলেন তার আঠারো দিন পরেই সত্যরঞ্জন ( নুতন বাবুর ছেলে) ফকা ও সাকা সহ আরো ৫ জনের নামে মামলা করেন । কাগজ পত্র ঘাটতে গিয়ে ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পড়তে গিয়ে আমি কয়েকটা তারিখ নিয়ে বেশ দোটানায় পরেছিলাম । কেমন যেন মিলানো যাচ্ছিলো না । একটা তথ্য দেয়া হয়নি যে, সাকা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার কিছুদিন আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রায় ধরা পরে গিয়েছিলো , রাঙ্গুনিয়ার এক বাসায় । পরে তার পায়ে গুলি লাগে এবং সে কোন ভাবে বেঁচে যায় । তার কিছুদিন পরে ফকার ধরা খাওয়া আর তার সব ভাইদের পালিয়ে বেড়ানো, এসব কিছু মিলে সাকার গুডস হিলের বাড়ীটা একটি ভূতুড়ে বাড়ীতে পরিণত হয় । সাকা ১৯৭২ সালের মার্চের দিকে পাকিস্তানে যায় এবং সেখান থেকে লন্ডনে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকে ।এইদিকে সাকা পাকিস্তানে পাড়ি দেবার আগ পর্যন্ত গোপনে শেখ কামালের মাধ্যমে অনেক তদবির করতে থাকে তাদের কে প্রাণে বাঁচাবার জন্য , কিন্তু যতদূর জানা যায় বেগম মুজিব সাকাকে সাহায্য করতে কামাল কে নিষেধ করেন ।

আমরা এই বিষয়ে আরেকটি ইঙ্গিত পাই শেখ হাসিনার ১৯৯৮ সালের ৯ ই জুলাই বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যের মাধ্যমে । ‘এখন তিনি টাকার গরম দেখান, ’৭১ সালে সাহায্যের কথা বলেন, এই টাকা কোথা থেকে এসেছে? সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুট করে, সামরিক জান্তার পা চেটে এই টাকা এসেছে । তার বাবা বেঁচে থাকলে তার পেটে হাত দিলে ৩২ নম্বরের ভাত পাওয়া যেত । ’৭১ সালের পর জীবন ভিক্ষার জন্য তার চোখের পানিতে ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়ি ভিজেছে । তার মুখে বড় কথা শোভা পায় না।’

এখন আমার মূর্খ মনে একটি নির্দোষ প্রশ্ন জাগে । তা হলো, প্রধানমন্ত্রী ৭১ সালে কোন সাহায্যের কথা বলছেন? তবে কি সাকা পরিবার, শেখ পরিবারকে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অর্থনৈতিক ভাবে সাহায্য করেছিলেন ? ঠিক বুঝতে পারছি না । যাই হোক, এসব রেখে আমাদের আলোচ্য সাকা পশুতেই বরং ফিরে আসি ।

১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে সাকা লন্ডনে এজওয়্যার রোডের একটি বাড়িতে গিয়ে ওঠে তার আরেক আত্মীয়ের সাথে । পরবর্তীতে ওয়েস্ট লন্ডনের বেলসিজ পার্কে নিজস্ব ফ্ল্যাটে উঠে । এখানেই সাকা নিজেকে ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে তার পাকিস্তানী লিঙ্ক আর আওয়ামীলীগ বিরোধী নেটোওয়ার্ক গুলোর মাধ্যমে । আগেই বলেছি সাকা পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায় ১৯৬৮ সালে । ফকার রাজনৈতিক শক্ত পরিচয় (১৯৬২ সালে ১৪ই জুলাই এ মন্ত্রীত্ব গ্রহন ও ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত কনভেনশন মুস্লীম লীগের স্পীকার) , আইয়ূব খানের সাথে হট লিঙ্ক,আর পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ভালো সম্পর্কের জের ধরেই সাকা, পাকিস্তানে ফকার হয়ে সে সম্পর্ক গুলো বজায় রাখে । এইসব কারনেই সেই ষাট দশক থেকেই সাকার পরিবারের সাথে পাকিস্তানের উঁচু রাজনৈতিক পরিবারের যোগসূত্র যা বর্তমানের কিছু ঘটনা দিয়ে আমরা অতি সহজেই বুঝে নিতে পারি যখন সাকার ছেলে হুমাম কাদের চৌধুরীর (হুকাচৌ)ও মেয়ে ফাইজা কাদের চৌধুরীর বিয়েতে পাকিস্তানের বড় সড় মন্ত্রীদের আগমন হয়,কিংবা কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করলে অথবা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বেঞ্জীর ভুট্টোর স্বামী আসিফ আলী জারদারী প্রথমবারের মত কোনো বাংলাদেশী রাজনীতিবিদকে ফুলের শুভেচ্ছা পাঠায় পাকিস্তানী হাইকমিশনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার মাধ্যমে ।

আসিফ আলী জারদারী ছাড়াও ১৯৭৭-১৯৭৮ সালে কুখ্যাত আন্তর্জাতিক চোরাচালানি আব্বাস মাস্তানের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে । উল্লেখ্য যে, ১৯৭৬-৭৭ সালে সাকা জ়িয়া এয়ারপোর্টে ব্রোকার হিসেবে তার নেটওয়ার্ক পরিচালিত করত । এর পর দুবাইতে, আরেক চোরাচালানী ও ধন কুবের আব্বাস মাস্তানের সহযোগিতায় সে চোরাচালানীর ঈশ্বর এবং সন্ত্রাসের আরেক নাম দাউদ ইব্রাহীমের সাথে পরিচিত হয় । করাচীর আরেক চোরাচালানী, ইমতিয়াজ খোয়াদ্দাদের সাথেও সাকার ব্যাবসায়িক সম্পর্ক আছে বলে ২০০৭ সালে তত্বাবাধায়ক সরকারের আমলে গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয় ।

১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তন সাকার পুরো রাজনৈতিক জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট । এ সময় ,বংগবন্ধুর স্বঘোষিত খুনী রশীদ এবং ফারুকের সাথে (পরবর্তীতে ফ্রীডম পার্টির হর্তা কর্তা) সাকার যোগসাজস হয় । খন্দকার মোশ্তাকের সাথে ফকা চৌধুরীর খুব ভালো সম্পর্কের জের ধরে সাকা শুরু করে তার নতুন রাজনৈতিক জীবন । সে সময় দেশে ফিরে এসে আরেক রাজাকার সবুর খানের (যার কবর এখন আসাদ গেট আড়ং এর উলটা দিকে বাঁধানো অবস্থায় দেখা যায় ) মুসলিম লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। কিন্তু সাকা চৌধুরী বুঝেছিল আলোচনায় আসতে হলে বিরোধিতার ভূমিকায় আসতে হবে। সে কারণে সে জাতীয় সংসদে সে সময়ের তরুণ ত্রয়ী রাশেদ খান মেনন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও শাজাহান সিরাজের সঙ্গে একতালে চলতে শুরু করে। ফলে দলনেতা সবুর খানের বিরোধিতার মুখে পড়তে হলে সে অপর মুসলিম লীগ সংসদ সদস্য ইব্রাহিম খলিলকে নিয়ে মুসলিম লীগের আলাদা গ্রুপ গঠন করে । সংবিধানে তখনও দলত্যাগ করলে আসন শূন্য হওয়ার বিধান থাকলেও সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধি না থাকায় সে তা থেকে পরিত্রাণ পায় । আবার যখন এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন, সাকা চৌধুরী তখন তার সঙ্গে ভিড়ে মন্ত্রিসভাতেই জায়গা করে নেয় (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রী এবং পূর্ত মন্ত্রী ।)

জানা যায়, এ সময় সাকা চৌধুরী ও সালমান এফ রহমান জুটি এরশাদের সঙ্গে মিলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিপুল বিত্তবৈভব সঞ্চয় করে ।( পরবর্তীতে এই সাল্মান এফ রহমানই সাকার বিরুদ্ধে মামলা করে, গিকার পক্ষ নিয়ে , এই বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে ) কিন্তু কূট রাজনীতিতে সিদ্ধ সাকা চৌধুরী এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের ক্রোধের বিস্তার দেখে আরেক রাজনৈতিক ফেরেপবাজ সাংবাদিক আনোয়ার জাহিদকে নিয়ে মন্ত্রিসভা ত্যাগ করে এনডিএ গঠন করে ।এই আনোয়ার জাহিদই পরিচিত ছিলো প্রবল ভাবে পাকি পা চাটা সাংবাদিক হিসেবে । যার স্বরণ সভাতেই ১৯৭৫ সালে বংগবন্ধুকে স্বপরিবার সহ নির্মম হত্যাজজ্ঞকে সঠিক ও সময়াপোযোগী ছিলো বলে মন্তব্য করে । ১৯৯০ এর শেষ দিকে ঐ এনডিএ-ই পরে এনডিপিতে রূপ নেয় এবং সাকা চৌধুরীর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করে ।

১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পর সাকা চৌধুরী আবার রাজনীতির ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতে ওঠে । শেখ হাসিনার সঙ্গে পারিবারিক অতীত সখ্যতার সুযোগ নিয়ে সাকা চৌধুরী বিরোধী দলনেত্রীর অন্যতম উপদেষ্টায় পরিণত হয়। জানা যায়, আওয়ামী লীগ দলের মধ্যে বিশাল আপত্তি থাকলেও সাকা চৌধুরী দলের অন্যদের সঙ্গে মিলে শেখ হাসিনাকে সংসদ বর্জন ও পদত্যাগে প্ররোচিত করে । লক্ষ্য ছিল দেশে আরেকটি সামরিক শাসন আনা । সেটা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি । তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গণআন্দোলনই সরকার পরিবর্তনের পরিণতি লাভ করে । এবার কিন্তু সাকা চৌধুরী এতদিন হাসিনার সঙ্গে মিলে যে বিএনপির বিরোধিতা করেছে সেই বিএনপিতেই ভিড়ে যায় এবং অচিরেই সেই দলের দক্ষিণপন্থীদের সংগঠিত করে নিজের অবস্থান দৃঢ় করে ।

একটা ব্যাপার এখানে লক্ষ্যনীয় যে, ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনা কি করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে রাজাকার,লুটেরা বলে সমালোচনা করেন, যেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার উপদেষ্টা মন্ডলীর একজন সদস্য ছিলো ? শেখ হাসিনার এই ধরনের নিম্ন মন মানসিকতা,ক্ষমতায় যাবার প্রবল আকাঙ্খা আর ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আমাকে প্রায়ই হতবাক করে তোলে । এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের উদাহরণ আওয়ামীলীগ এর আগেও দেখিয়েছে জামাতকে তাদের আন্দোলনের সংগী করে, খেলাফত মজলিশের সাথে নির্বাচনী মোর্চা করে । সে তুলনায় আমি খালেদা কে আসলে অনেক উপরে রাখি । কারন এই মহিলা জানে তার লজ্জা ও শরম কিছু নেই এবং সে তা মানুষ কে বুঝিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না । সালাউদ্দিন যখন ২০০১ ইলেকশনের আগে বলে,

“এতোদিন জানতাম কুত্তা লেজ নাড়ায়, এখন তো দেখি লেজ কুত্তাদের নাড়ায়”।

খালেদা জিয়া কে ভাব বাচ্যে কুত্তা বল্লেও আপোষহীন নেত্রী রাগ করেন নি । পরম মমতায় তিনি বুকে টেনে নিয়েছেন আমাদের “শা”লা উদ্দিন কাদেরকে । আর সেই কুত্তার দুই বাচ্চা দুনিয়ার সব মানুষ্কে মারল,ধরল আর নির্যাতনের পর নির্যাতন করে ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে দুই ভাই কোমরে ব্যাথা নিয়ে দেশ ছেড়ে ভাগলো । শুধু সাকাকে কিছু করল না । সাকাই বরং তাদের দুই জনকে উদ্দেশ্য করে বলল।

“ আমি কি পুতের রাজনীতি করি নাকি , যে তাদের মুক্তি চাইতে হবে ?”

দেখে শুধু বিষ্মিত আর অবাক হই ।

আসলে সাকাকে দোষ দিয়ে কি হবে ? কেনই বা সাকা কে দোষ দিব ? এই কুকুর ডাকার ফলশ্রুতিতে সাকা হলো বিরোধী দলীয় সংসদ উপনেতা । আর দল থেকে ও আই সি’র লিডার হবার মনোনয়নও পেল । আপনি একজন বাংলাদেশী হয়ে শুধু বাল ছিড়বেন আর বসে বসে তা দিয়ে আঁটি বাধবেন । খুব বেশী খারাপ লাগলে মাথায় ঠান্ডা পানি দিয়ে বসে থাকবেন । কিন্তু টুঁ শব্দটি করবেন না । এইটা আমার , আপ্নার,আমাদের কৃতকর্মের ফসল । ভোট দেওয়ার সময় ভাবি নাই কেন সাকার মত রাজাকার সংসদে যাবে ? ভোট দেওয়ার সময় ভাবি নাই কেন যে, ভোট যখন আমরাই দিয়েছি তখন দেখেই দিচ্ছি কি না, ভোট দেয়ার সময় আমাদের রাজাকার রাজাকার এইসব হুংকার কই থাকে ? কেন দেশ জুড়ে রাজাকার মারা “এ টিম” তৈরী হয় না ? কেন সংসদে গেলেই চিতকার করি ? ও সাকা…ও সাকা বলে ? শুধু ভোটের পরেই আমার মত বাল পাবলিকদের যত আস্ফালন ।

ইয়েস!!! সাকাই এই কথা বলবার যোগ্য দাবিদার-

‘মানুষ আমাকে ৩০ বছর ধরে সংসদে পাঠিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে আজ আমাকে আবার যোগ্যতা প্রমাণ করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।“

আসলেই তো !! আপ্নারা ভোট দিয়ে দিগদারি করবেন আর , পশু সাকা কথা বলতে পারবে না ?? হাস্যকর!!

মাঝে মাঝে আমার চট্রগ্রামের মানুষদের প্রতি, রাঙ্গুনিয়ার মানুষদের প্রতি,রাউজানের মানুষদের প্রতি,ফটিকছড়ির মানুষদের প্রতি ঘৃণায় চোখ-মুখ কুঁচকে আসে । এই অঞ্চলে সাকার মত পশু,একটা অমানুষ কি করে ৪৯,০০০ হাজার,৬৫০০০ ভোট পায় ? একটা মানুষ কি নেই যার বুক আছে, একটা মানুষ কি নেই যার মুখ আছে যে চিতকার করে বলতে পারে, “রাজাকার মুক্ত, সাকা মুক্ত চট্রগ্রাম চাই ?” আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা , মেয়র মহিউদ্দিন বলে উনি মুক্তিযোদ্ধা । কিসের মুক্তিযোদ্ধা তারা ? তারা কি ঘরের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলো? তারা কিভাবে এই নরপশুটাকে এভাবে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে ? কেন আব্দুল্লাহ আল নোমান প্রতিবাদ করেন না যে সাকা বি এন পি তে থাকলে তিনি থাকবেন না ? কেন খোকা প্রতিবাদ করেন না ? কেন মান্নান ভুইয়া বি এন পি’তে থাকা অবস্থায় প্রতিবাদ করেন নি ? তিনি না এককালের মারক্সিস্ট ? তিনি না একসময় বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন মতিয়া,মুকুল বিশ্বাসদের নিয়ে ? কই তারা ? কোথায় তাদের বুক আর পাঁজর ?? কোথায় ??

নাহ্, আজ সম্ভবত আমি বড্ড বাজে বকে ফেলছি । কি করে তারা তা বলবেন ? একাত্তরের ওই বুক কি আর ৩৮ বছর পরেও থাকে ? সেই তেজ কি আর থাকে ক্ষমতার দেখা পেলে ? সুতরাং, বাদ দেই সে সব ।

এবারও সাকার কৌশল ছিল বিএনপিকে সংসদ থেকে পদত্যাগ করানো । দলের দক্ষিণপন্থীদের জড়ো করে সেই খেলা সাঙ্গও করে ফেলেছিল। কিন্তু দলের ‘নরমপন্থীরা’ বেঁকে বসায় সেটা আর হয়নি। দল থেকে কিছুটা বিচ্ছন্ন হয়ে সাকা চৌধুরী এবার বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেই নেমে পড়ে । চট্টগ্রামের আবদুল্লাহ আল নোমান, ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা আগে থেকেই তার চোখের বিষ ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই আক্রমণে নামে সাকা চৌধুরী । বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতের কারণে তাকে শেষ পর্যন্ত দল থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়। কিন্তু নির্বাচনের সময় বিএনপির পাঁচটি আসনে নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিলে বিএনপি আবার তাকে দলে ফিরিয়ে আনে ।

সাকা বার বার আসন পরিবর্তন করে আর সব সময়ই নতুন আসন থেকে নির্বাচিত হয় । ৯১ এন ডি পি’র হয়ে দাড়িয়েছিল রাউজান থেকে,এবং পরাজিত করেছিলো আওয়ামিলীগের আব্দুল্লাহ আল হারুন (বি এন পির আরেক প্রভাবশালী মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমানের ভাই)। ১৯৯১ সালের ২৫শে এপ্রিল এই হারুনই সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং তার দুষ্কর্মের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে একটি নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা দায়ের করেন। সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী ছিল মামলাটির সাতজন বিবাদীর মধ্যে সর্বপ্রথম । সালাউদ্দীনের দুষ্কর্ম উল্লেখ করে আবদুল্লাহ্ আল হারুন বলেন, “সর্বপ্রথম বিবাদী, বলপ্রয়োগ করা, নির্মমতা এবং সন্ত্রাসে বিশ্বাসী । সে কখনো আইনের তোয়াক্কা করেনা । নির্বাচনের আইন-কানুনের প্রতি তার কখনো শ্রদ্ধা ছিলনা। জনগণের অধিকারেও সে বিশ্বাস করতোনা । ১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তানী শক্তিকে সমর্থনের সময় প্রথম বিবাদী স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে অমার্জনীয় এবং জঘন্য ভূমিকা পালন করেছিল। বহু লুটপাট ও হত্যাকান্ডের সাথে সে জড়িত ছিল । ১৯৭২ সালের ১৩ই এপ্রিল চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় তার বিরুদ্ধে দালাল আইনে মামলা করা হয়,মামলার ক্রমিক নাম্বার ছিল ১৭ ।” পরবর্তীতে এই মামলার কি অবস্থা হয়েছিলো তা জানা যায় নি ।

সাকা ১৯৯৬ তে যখন দেখল অবস্থা ভাল না, ছোট ভাইয়ের হাতে রাউজান ছেড়ে দিয়ে দাড়ালো পার্শ্ববর্তী রাংগুনিয়ায়। সে বছর গিকা পাশ করলেও ২০০১ এ গিকা ফেল করল চট্রগ্রাম মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিনের ভাই, এ বি এম ফজলে করিমের কাছে । মহা ধুরন্ধর সাকা এইবার (২০০৮) দেখল রাউজান-রাংগুনিয়া কোথাও পাশ করা যাবেনা, দাড়ালো গিয়ে ফটিকছড়ি । ফলাফল হলো সাকা পশুটি আবারও পাশ করছে । কিন্তু রাউজান-রাংগুনিয়া দুই জায়গাতেই নৌকা জয় লাভ করেছে । এইসব হলো সাকার হিসাবজনিত রাজনীতি । সাকা রাজনীতির মাঠে একজন পাকা খেলোয়ার । সে যানে কখন কোন আসন থেকে তাকে দাড়াতে হবে । এই বছর বি এনপির ভরাডুবিতে সবচাইতে লাভবান হয়েছে মূলত সাকা চৌধুরী । অন্য সব হাই ডিনামাইট নেতারা ফেল করাতে এবং বিএনপি কয়েকশ খন্ডে বিভক্ত হয়ে যাওয়াতে খালেদা জিয়ার উপর তার এখন একচ্ছত্র আধিপত্য, এ কথা বলাই যায় । তাইতো মওদুদ এখন বিরোধী দলীয় উপনেতা হওয়াতে । তাকে সে সুবিধাবাদী,পোল্টিবাজ অভিহিত করে , দম্ভোক্তি করে বলতে পারে এই বলে যে,

‘এই লোকটির রাজনৈতিক জীবন সুবিধাবাদের ইতিহাসে ভরা। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি পোস্ট মাষ্টার জেনারেল ছিলেন। তারপর শহীদ জিয়ার মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী। এরশাদের সময় মন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি কতকিছু । এরশাদের পতনের পর হাওয়া দেখে আবার বিএনপিতে ফিরে আইনমন্ত্রী । এখন আবার সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা হতে সেকি তোড়জোর । তিনি বলেন, জাকাতের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে এরা এ সমস্ত কর্মকান্ড করে কিভাবে তাই প্রশ্ন। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, বগুড়ার উপনির্বাচনে আমাদের দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে চেয়ারপার্সন নির্বাচন করতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি করেননি। তিনি বলেছেন, আমার নিজের এলাকার ভোটাররা আমাকে ভোট দেয়নি। আমার উচিত হবে না বহিরাগত হিসেবে অন্য কোনখানে নির্বাাচন করা। কিন্তু আমার বন্ধু মওদুদ কিন্তু করেছেন। তারতো উচিত ছিল নির্বাচনে ভোটাররা তাকে পরাজিত করার পর স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগ করা। দল যদি তার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতো তাহলে তাকে আবার সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে আনতো। এতে দলেও একটি শুদ্ধ গণতান্ত্রিক রীতি প্রতিষ্ঠা পেত।”

সরকারের সঙ্গে মওদুদ আহমেদের সম্পর্কের বিষয়ে সাকা বলে,

“বিএনপির চেয়ারপার্সন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী ম্যাডাম জিয়ার দুদকের মামলা এখনও প্রত্যাহার হয়নি, কিন্তু ব্যারিস্টার মওদুদের মামলা কিন্তু প্রত্যাহার হয়েছে। বর্তমান আইনমন্ত্রীর কথাকে সমর্থন করে চৌধুরী বলেন, তার বক্তব্য ঠিক। ওনি তো পূর্ব থেকেই সুবিধাভোগী। বেনিফিসিয়ারী।গত ৩০ বছর সংসদের আসনে বসে নিজকে ধন্য করিনি বরং যে আসনে বসেছি সে আসনটি ধন্য হয়েছে”

অথচ দেখেন, আপনারা যদি উপরে ভালো করে পড়ে থাকেন তাহলে দেখবেন, সাকা পশুটি নিজেই প্রথমে কনভেনশন মুসলিম লীগ,পরে আবার সবুর খানের মুস্লিম লীগ,পরে এন ডি পি,এর পর জাতীয় পার্টিতে মন্ত্রী,তারপর আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য,এর পর বি এন পি । এবার বিচারের ভার আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম যে , দাদী শাশুরী কাকে নানী শাশুরী বলে, আর কেনই বা বলে ?

বি এন পি’র সব বড় নেতা নির্বাচনে পরাজিত হবার সুযোগেই সাকা বলতে পারে,

“বিএনপি একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক দল । এখানে নানা মতের নানা আদর্শের লোকজনের সমাবেশ ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে বিএনপির কোন ক্ষতি নেই । কারণ বিএনপি সকল জাতীয়তাবাদী শক্তির একটি সম্মিলিত প্লাটফরম । মহাসমুদ্র । সমুদ্রে যেমন নদীর পানিও মিশে, আবার নালা-নর্দমার ময়লা-নোংরা পানিও মিশে- এতে সমুদ্রের কিছু যায় আসে না । তেমনি বিএনপিতে সত্যিকার জাতীয়তাবাদী, মান্নান ভূইয়াদের মত বামপন্থী, কমিউনিস্ট- সকল ঘরানার আশ্রয় মিলেছে। সবাই ইমাম হিসেবে বিএনপিকেই মানে”

সংস্কারপন্থীদের বিএনপিতে পুনরায় আশ্রয় দেয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করে সাকা চৌধুরী বলে,

“ওরা যাবে কোথায়? ওদের ফিরে আসার সুযোগ দেয়ার কথা ম্যাডামের ভেবে দেখা দরকার। দলে ফিরিয়ে কাজ করতে দেয়া উচিত। মান্নান ভুইয়াদের দলে ফিরতে অনেকেই বাঁধা সৃষ্টি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দুর্বল চিত্তের লোকরা মনে করে ওমুক দলে ফিরলে আমার কর্তত্ব ফুরিয়ে যাবে। আমার এতে কোন অসুবিধা নেই। অসুবিধা তাদেরই যারা জনগণের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য রাজনীতি করে না। বাপের কিছু নেই তাই দুই নম্বরী করে কামিয়ে আখের গুছাতে এরা রাজনীতিতে এসেছে। ওয়ান ইলেভেনের পর অনেকের সম্পর্কে জানা গেছে, ঢাকা শহরে তার ৫৮ টি ফ্ল্যাট বাড়ি আছে। গাড়ী আছে অনেকের কুড়ি, বাইশটি। কিন্তু একজন মানুষ কয়টি বাড়িতে থাকে? কয়টি গাড়ীতে চড়ে বেড়ায়? কিন্তু দলে ফিরতে দিলেও যেমন মান্নান ভূইয়াকে মহাসচিব করা যাবে না, তেমন তাদের এটা আশা করাও ঠিক হবে না”

নির্বাচন কমিশন, মনোনয়ন পত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা উল্লেখ করতে বলেছে, এই ক্ষেত্রে আবারো খালেদা জিয়াকে ভাববাচ্যে ধূর্ত সাকা অপমান করে এই বলে যে,
“ এটি নিইর্বাচন কমিশনের অত্যন্ত হীন একটি কাজ হয়েছে । এই কাজটি করবার একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে ম্যাডাম কে অপমান করা”

লক্ষ্য করে দেখেন কি করে, অতি চালাক পশু সাকা একরকম বলেই দিলো যে খালেদা জিয়া অশিক্ষিত ।

আওয়ামীলীগকে জামায়াতের চেয়েও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল উল্লেখ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলে,

‘৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর শত্রু সম্পত্তি আইন করা হয়। এটাই স্বাধীনতার পর আওয়ামীলীগ করে অর্পিত সম্পত্তি আইন। তাদের নেতা ফনী ভূষন মজুমদার, শুধাংশু শেখর হালদার, মনোরঞ্জন ধর প্রমুখের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু আওয়ামীলীগ কি সেই আইন আজ পর্যন্ত বাতিল করেছে? করেনি। কারণ হিন্দুদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তির শতকরা ৯৯ শতাংশই ওরা দখল করে খাচ্ছে। এ কারণে তারা তাদের কাজ দিয়েই প্রমাণ করেছে, এরা সাম্প্রদায়িক একটি দল।ওয়ান ইলেভেনের স্রষ্টা কাকা-দাদাবাবুদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন এমন মন্তব্য করে বলেন, আব্দুল জলিলের ব্যর্থতা তিনি কাকাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারেননি। এজন্য তাকে ঝরে পড়তে হলো ”

শেখ হাসিনা যখন সাকা কে সোনা চোরাচালানী বলে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ঠিক তার জবাবে সাকা বলার সাহস পায়,

“ শেখ হাসিনা আমার সোনা নিয়া টানা টানি করে ক্যান ? ওয়াজেদ মিয়ার কি সোনা নাই ?”

আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে চিতকার করে,গম গম করে বলতে পারে, “ইয়েস । আমি রাজাকার ছিলাম, এখন কে কোন বাল ছিড়বে ?”

নির্বাচন কমিশনকে বলতে পারে, “ওদের কাছে কি জবাব্দিহি করব ? ওদের কে তো চাকরি দিয়েছি আমরাই । ওরা আমাদেরকে জি স্যার , জি স্যার করত । এদের কথার আবার কিসের জবাব ?”

মইন ইউ সম্পর্কেও সাকা বলে,

“এরকম আরও অনেক গাদ্দারকে বিএনপি প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। উচ্চ পদে বসিয়েছে। রুটি রুজির ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তারা কি করেছে? করেছে চরম গাদ্দারী। মোনাফেকি। আসলে এটাই হওয়ার কথা। আল্লাহর কথা বাদ দিলাম, প্রকৃতির প্রতিশোধ বলতে একটা কথা আছে না। অন্যের প্রতি ইনজাস্টিস করলে তার কাফফারা অবশ্যই দিতে হয় ।”

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সম্পর্কে তার দেয়া বক্তব্যের পর আইন প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে সাকা চৌধুরী বলে,
“বট তলার মানুষরা কে কোথায় কি বলল, তার জবাব আমি দিতে প্রস্তুত নই। ব্যাঙ্গ করে তিনি বলেন, বর্ষাকালে কত রকমের ব্যাঙের ডাক শোনা যায়। তাই বলে সব ডাকের কি জবাব দেয়া যায়। কোলা ব্যঙরা ডাকবেই তাতে হাতির কিছু আসে যায় না । এসব ডাক উপেক্ষা করেই হাতি সামনে এগিয়ে যাবে”

বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তাহীনতার জন্য আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে দায়ি করে সাকা চৌধুরী বলেন ,”এ আইনের নাম হওয়া উচিত ছিলো, মালেকুল মউত আইন”

তাকে যুদ্ধপরাধী বলা হয় সাংবাদিকদের,এই প্রশ্নে পশুটি আবারো কৌতুক করে বলে,

“ আমার পিতা অখন্ড পাকিস্তানে বিশ্বাস করতেন। তিনি পাকিস্তান মুসলীম লীগের সভাপতি ছিলেন। ভারতের সঙ্গে টিকে থাকতে একটি শক্তিশালী ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান তিনি চেয়েছেন। এটা তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ, রাহাজানি, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি কাজগুলো আমার পিতা কি করেছেন? যদি তিনি এই ঘৃণ্য কাজগুলো করে থাকেন তাহলে জেলখানায় মৃত্যুর পর কেন তার জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। কেন তার কবর রক্ষীবাহিনী দিয়ে দীর্ঘ দিন পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাদের আশংকা ছিল, আমরা পিতার লাশের পরীক্ষার করে তাকে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারি ।সাকা আরো বলে , সাম্প্রদায়িক ভারতকে ঠেকাতে লাহোর প্রস্তাবের আলোকে দ্বি-জাতি তত্ত্বে পাকিস্তান হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশে কি হচ্ছে? ওপার থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা চালান করে দেয়া হচ্ছে। আওয়ামীলীগ দেশে ধর্ম নিরপেক্ষতা চালুর কথা জোর দিয়ে বলছে। তাহলে সীমান্ত রেখে কি লাভ। ওটা উঠিয়ে দিক। আমরা সরাসরি দাদাদের নমস্কার করে আসতে পারবো। ওদের লোকসভায় নির্বাচন করতে পারবো। দিল্লি লোকসভায় অংশ নিতে পারবো। এটাইতো মজার বিষয়। তিনি বলেন, আমি দেশের জনগণের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম আজ তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি হিসেবে থাকবে, না তথাকথিত সুশীলদের আমদানীকৃত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হিসেবে টিকে থাকবে। উত্তরাধিকার সূত্রে আমার সন্তানদের যাতে আর যুদ্ধাপরাধের দায় বহন করতে না হয় সেজন্য যে কোন স্বাধীনতার ডাক শুনার আগেভাগেই আমি তাতে সর্মথন দেই । আমার মরহুম বাবা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন বলে তার ছেলে হিসেবে আমাকে স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে । আর এ কারণে আমার ছেলেরা যাতে এ রকম পরিস্থিতি শিকার না হয়, সেজন্য আমি এখন যে কোনো স্বাধীনতা-আন্দোলনে আগে-ভাগেই সমর্থন দিতে চাই, যাতে আমার জন্য আমার ছেলেকে কেউ স্বাধীনতাবিরোধী না বলে।”

একটি দেশ,দেশের প্রশাসন,দেশের প্রধানমন্ত্রী,আইনমন্ত্রী,বিরোধীদলীয় নেত্রী,সমাজ,দেশের ইতিহাস,রাজনীতিবিদ সবাইকে অতি তুচ্ছ এক পল্কায় প্রতিটিদিন সাকা চৌধুরী হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছে । কেউ নেই কিছু বলবার । সবাই চুপ করে থাকেন কি এক অদ্ভুত মৌনতায় । আসলেই কি বলা যায় ? আমাদের কি আছে সাকার মত হাজার হাজার কোটি টাকা ? আমাদের কি আছে সি আই এর হট কানেকশন ? আমাদের পাশে কি আছে দাউদ ইব্রাহীম ? আমাদের পাশে কি আছে একটি গুন্ডা বাহিনী ? আমাদের কি আছে রাজনৈতিক বাবা আর দাদা ? আমাদের কি আছে নিচের এই সাম্রাজ্য গুলো ?

QC Shipping Limited
Multiport Limited
QC Container Line Limited
Intermodal Transport
QC Petroleum Limited
Dacca Dyeing & Manufacturing Company Ltd.
QC Enterprises Limited
QC Trading Limited
QC Feeders Ltd
QC Textile Limited
QC Farms Limited
QC Foundation
Feedermax ( S ) Pte Ltd

চলবে…

“সাকা” একটি পশুর নাম ( পর্ব-৩)

imagesপর্ব ১,২ এর পর একটি দিন বিরতি নিলাম । গৃহী হবার এই এক সমস্যা । সারাক্ষণ কেবল ঘর আর গেরস্থালী । সুতরাং ব্যস্ততা আর পিছু ছাড়ে না । আমি আগেও বলেছি, আজও আবার বলছি, সাকা কে নিয়ে লিখতে যাবার সময় নিজের ভেতর যে গ্লানি অনুভব করি তা ব্যাখ্যাতীত । একটি হাত,পা,রক্ত ও মাংশের অবয়বের একটি মানুষের অন্ততঃ একটি গুণ থাকেই । যা তাকে মানুষ নামটির জন্য স্বার্থক করে তোলে । খুব অবাক হলাম, সাকা নামের এই পশুটির ক্ষেত্রে মানুষের নামটির সংগাই যেন পালটে যাচ্ছে । একটি ভালো গুণ তো মানুষের অন্তত থাকা উচিত । কি ভালো বলব তার ? সাকা যখন কি এক বিভতস ভঙ্গিমায় নোংরা ইঙ্গিতে গা দুলিয়ে হাসে , পশুর মত তার দাঁত গুলো বের করে তার নির্মম কথা গুলোর তুড়ি ফোটায়্‌…তখন এই ভেবেই শুধু সান্তনা পাই , হাজার না পাওয়ার ভী্ড়ে আর আক্ষেপ করি না , নিজেকে প্রবোধও দেই না , বেঁচে যাওয়া মানুষের মত দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে এইটুকু তো বলতেই পারি ” আমি এই পশুটির মতন নই “। এর থেকে আর বড় আনন্দ কি হতে পারে ?

১ম ও
২য় পর্বের পর-

অনেকেই বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন সাকার জন্ম ও পরিবার নিয়ে কথা বলছি দেখে । অনেকেই আবার মনে করছেন এই প্রকাশ করাটা প্রয়োজনীয় । আমি আমার অবস্থান থেকে একটি কথা খুব স্পস্ট বলি, একটি মানুষের জন্মই আসলে মূল কথা । কিভাবে হলো কিংবা কিভাবে আসলো এই ব্যাপারটি ঠিক ওই অর্থে সমাজ জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না ঠিক যতক্ষণ না ওই মানুষটির তার জন্ম সঙ্ক্রান্ত বেদনায় অন্যকে বেদনাসক্ত করে না তোলেন । আপনারা এখন ভাবছেন আবেগে আমি যতই সাকাকে পশু বলি, একটি মানুষকে আসলে কোনভাবেই এই উপাদান গুলো দিয়ে বিচার করা অনুচিত । এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলি, সাকাচৌকে যদি কেউ মানুষ মনে করেন, তবে আমি নিশ্চিত , আপনি আপনার অতি মূল্যবান মানবিক অনুভূতিকে নেহাত “প্রচুর” ভেবেই জলাঞ্জলী দিচ্ছেন । সাকা,ফকা,গিকা,সাইফুকা(সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরী) এরা যেই পরিমাণে গত ৫০ বছর চট্রগ্রাম তথা পুরো বাংলাদেশের মানুষের উপর অত্যাচার আর নির্যাতন করেছে এবং করছে তা আপনি খতিয়ে দেখলে, আপনি লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাবেন । আমি যেহেতু সাকাকে নিয়ে অনেকটা বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করছি সে ক্ষেত্রে সাকার মানসিক ভাবে বেড়ে উঠা,পারিবারিক ভাবে বেড়ে উঠা এই ব্যাপার গুলো অন্তত আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আপনি যখনই কোন একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন, আপনি লক্ষ করবেন আপনাকে অতি অবশ্যই সেখানে জিজ্ঞেশ করা হবে, আপনার ফ্যামিলির পেছঙ্কার কথা, তথ্য,ইতিহাস । কখনো সরাসরি কিংবা কখনো জানতে চাওয়ার ছলে । এর কারন কি ? মনোবিজ্ঞানীরাও এই ধরনের পরীক্ষা গুলোর ক্ষেত্রে খুব জোর দেন তার বংশগতি ও তার ধারাগুলোর ক্রমান্বয় পর্যালোচনার প্রয়োজনে । আমার ধারনা এই সিরিজের কোন না কোন পর্যায়ে আপনারা সবাই আমার সাথে একমত হবেন যে সাকার পশুত্বের এই বিপর্যয় মূলত তার ফ্যামিলির ভয়াবহ প্রভাবেই হয়েছে বা কিছুটা হলেও দায়ী । তবে আমি আসলে অবাক হয়েছি একটা কথা ভেবেই যে, সাকাকে এখনো অনেকেই মানুষ মনে করেন । জানিনা ঠিক কি কারন হলে সাকাকে মানুষ নামটি দিয়ে মানুষ নামটির অপমান করা যায় । যারা এখনো মানসিক বিকাশের সাথে পরিবারের সম্পর্কটি ধরতে পারেন নি তাদের বলব নীচের এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে একটু কষ্ট করে পড়ে নিতে ।

http://www.physorg.com/news166117883.html

http://genetics.emory.edu/pdf/Emory_Human_Genetics_Family_History_Mental_Illness.PDF

http://www.medicalnewstoday.com/articles/156634.php

http://uk.answers.yahoo.com/question/index?qid=20090814072157AAHkQpY

আশা করি এই তথ্যগুলো আপনাদের সামান্য হলেও আমার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একসাথে চলবার প্রয়াস পাবে ।

বিগড়ে যাওয়া মানে এই নয় যে সাকা (যার পারিবারিক নাম খোকন )হঠাত করেই একদিন মাদকাসক্ত হয়ে গেলো কিংবা মানুষ খুন করা শুরু করলো অথবা মেয়েদের ধরে ধরে ধর্ষন শুরু করল । এই বিগড়ে যাওয়া হলো মাথার ভেতর ইঞ্জেক্ট করে দেওয়া ফকার পারিবারিক রেওয়াজ ও দম্ভ । “আমরা চৌধুরী, আমরা হলাম এই চট্রগ্রামের পালন কর্তা,” এই ব্যাপার গুলো মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া । সাকার জন্ম ইতিহাসের কারনেই পারিবারিক ভাবেই এই পশুটি কিছুটা নিগৃহীত ছিল, সে সময় থেকেই তার আরো দুই ভাই গিয়াসুদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে গিকা ও সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাইফুকার সাথে তার শৈশব কালীন দূরত্ব পারিবারিক ভাবেই একটি সুক্ষ্ণ সীমানা টেনে দেয় যা ধূর্ত সাকার কখনই বুঝতে সমস্যা হয়নি । ফকার অত্যন্ত প্রিয় পূত্র হবার সুবাদে অবশ্য এইসব পারিবারিক টানাপোড়নে সাকা বার বারই পার গেছে । ফকা পারিবারিক এই জটিলতা বুঝতে পেরে ১৯৫৭ সালে তাকে একবার পাঞ্জাবের সাদিক’স মাধ্যমিক স্কুলে পাঠিয়ে দেয় , অবশ্য তার পরের বছরই ফকা তাকে ফিরিয়ে এনে চট্রগ্রামের সেন্ট প্লাসিড স্কুলে ভর্তি করায় । নবম শ্রেণীতে পড়বার সময় একজন সম্মানিত স্কুল শিক্ষককে বন্ধু-বান্ধব সহ নির্যাতনের অভিযোগে সাকাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয় । কিন্তু প্রভাবশালী বাবার ছত্র ছায়ায় বিষয়টি মিটমাট করা হয় এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেই সাকা মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করে ।সাকা তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে শেষ করে চলে যায় পাকিস্থানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৬৮-৭০) যেখান থেকে এই পশুটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রী করায়ত্ত করে ।

সাকার বাবা ফকা চৌধুরী বৃটিশ শাষনামলের শেষ দিকে তখনকার চলতে থাকা ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে পা রাখে এবং ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সামরিক শাষনের সময় মন্ত্রীসভার সদস্য হয়। পরবর্তীতে তাকে ততকালীন অবিভক্ত পাকিস্তানের কনভেনশন মুসলিম লীগের স্পীকার (২৯-১১-১৯৬৩ থেকে ১২-০৬-১৯৬৫) বানানো হয় ( এই কনভেনশন মুসলীম লীগ সামরিক শাষক আইয়ূব খানের মাধ্যমে ১৯৬২ সালে গঠিত হয় মুল মুসলীম লীগ থেকে সরে এসে ) । প্রবল পাকিস্তান প্রীতি আর পাকি পা চাটার পুরষ্কার স্বরূপ ফকা ধীরে ধীরে রাজনীতির মূল ক্ষেত্রে তার অবস্থান তৈরী করে নেয় ।এ সময়ই রংপুর সদরে তার নির্দেশে ছাত্র আন্দোলনের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালানো হয় । চট্টগ্রামে বিরোধীদের বিরুদ্ধে লালদীঘির ময়দানে তার গুণ্ডাবাহিনীকে সে আহ্বান করে ‘শুককুয্যা কডে’ চিৎকারে। তার এ হুঙ্কার ছিল পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনীতির একটি ব্যাপক আলোচিত ঘটনা । এখানে জেনে রাখা দরকার বৃটিশদের আজ্ঞাবহ সাকার দাদা ছিলো ততকালীন পুলিশের দারোগা (পরবর্তীতে দূর্নীতির দায়ে বহিঃষ্কৃত )। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে,পাকিস্তান পর্বের শুরুর দিকে ১৯৪৮ সালে ফকার গুদাম থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ের ১১৫ মণ তামার তার উদ্ধার হলে বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল’ এ্যামেন্ডমেন্ট এ্যাক্টে তাকে ১০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ২ সপ্তাহের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। ফজলুল কাদের চৌধুরী রাজনৈতিক পরিচয় দেখিয়ে হাইকোর্টের মাধ্যমে দণ্ড মওকুফ করানোর চেষ্টা করলে বিচারপতি তার আবেদন মঞ্জুর না করে বরং তার সাজা আরও বাড়িয়ে অর্থদণ্ডের পরিবর্তে ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন । তথ্য পত্রে এই মামলাটি ফজলুল কাদের চৌধুরী বনাম ক্রাউন নামে লিখিত আছে (২ , ঢকা ল’ রিপোর্ট ১৯৫০ )
একটা ব্যাপার এখন বেশ সংক্ষেপে নিয়ে আসা যায়,

১। সাকা তার জন্ম সঙ্ক্রান্ত উত্থাপিত উতসে বরাবরি একটা হীন মানসিকতায় ভুগত ( যেহেতু পারিবারিক ভাবে ও পরিবারের বাইরে বিভিন্ন সময়ে ও স্থানে তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে এটি বুঝিয়ে দেয়া হতো এবং বর্তমানে তার নজির আমরা পাই সম্পত্তি সঙ্ক্রান্ত বিরোধে পুরো ফ্যামিলির তার বিরুদ্ধে চলে যাওয়া যা সামনে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে )
২।সাকার বাবা ফকার প্রবল পাকিস্থান প্রীতি আর তার বিপরীতে তীব্র হিন্দু বিদ্বেষ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি অচিন্তনীয় আক্রোশ ও সন্দেহ ।
৩। ফজলুল কাদের চৌধুরীর দূর্নীতি
৪।সাকার দাদার দূর্নীতি (দূর্নীতির দায়ে বহিষ্কৃত দারোগা )

এই ব্যাপার থেকে একটা সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, জন্ম পরিচয় সঙ্ক্রান্ত টানা-পোড়েন, পারিবারিক দূর্নীতি ও লুটপাট,অন্য ধর্মের লোককে কিংবা যে কোন মানুষকে ছোট করে দেখা, প্রবল অহমিকায় এক ধরনের স্নবিশ আচরণ সাকার পারিবারিক শিক্ষা । সুতরাং এই ব্যাপারগুলো যে একধরনের সামাজিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কিংবা সামাজিক অবকাঠামোর সাধারণ চিন্তা ও চেতনার বাইরে পড়ে তা কখনই সাকা জানতে পারেনি । যেহেতু রাউজান ও গহিরা বরাবরই ছিলো হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত অঞ্চল, সুতরাং ফকার এই একটি চিন্তাই তার রাজনীতি দর্শনে স্থান পায় যে , ভারত থেকে আসা এইসব হিন্দু তাকে কখনো ভোট দিবে না বা তাদের সমর্থন পাবে না । সে অঞ্চলে ওইসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যাক্তি ছিলেন শ্রী নতুন চন্দ্র সিংহ । বিপুল দারিদ্রে্র পরেও তাঁর এই জনপ্রিয়তা বড় পশু ফজলুল কাদের চৌধুরীকে বরাবরের মতই ভেতরে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিতে থাকে যা কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের জায়গা নিয়ে নূতন বাবুর সাথে তার সংঘাত দেখে অনুমেয় হয় এবং ১৯৭১ সালে তাঁকে হত্যার মাধ্যমে (যা পরে বিস্তারিত লেখা হবে)ফকার ভেতরকার হিংস্রতা ও আক্রোশ আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি । একটি, মজার তথ্য এখনই বলা উচিত যে, সে সময় ফকা চৌধুরীর বাড়িতে শুধুমাত্র চট্রগ্রামের আঞ্চলিক এবং তার বাইরে উর্দূতে কথা বলবার কঠিন নিয়ম ছিলো । সাকা চোধুরীর বেড়ে ওঠা এই ধরনের একটি অসুস্থ আবহের মধ্যে দিয়েই হয় । পারিবারিক সূত্র থেকে পাওয়া একটি তথ্য আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যা হলো,সাকার নামে ছোট বেলা থেকেই প্রচুর অভিযোগ আসত । বিভিন্ন জনের সাথে মারামারি, দল বল সহ পিটানো, নির্যাতন এবং এই ব্যাপার গুলো নিয়ে ফকার বাসা পর্যন্ত বিচার চাইতে আসার সাহস কারো ভেতর ছিলো না । সুতরাং শৈশব আর কৈশোর থেকে সাকা পেয়ে যায় মানুষ কে মারবার ও আক্রমণ করবার এক পশুত্বের লাইসেন্স । জহুরী যেমন স্বর্ণ চিন্তে ভুল করেনা তেমনি বড় পশু ফকাও ছোট পশু সাকা কে চিনতে ভুল করেনি ।ফকা চৌধুরী ঠিকই বুঝতে পেরেছিলো যে তার পশু মনের সত্যকারের ধারক ও বাহক হতে পারে একমাত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে খোকন ।বাবা ফকাচৌ এর আদর্শের হাত ধরে সাকা ক্রমাগত দূর্ধর্ষ হতে থাকে ।
১৯৭১ সালের এপ্রিলের শুরুতে সাকার পিতা ফকা চৌধুরী চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বৈঠক করেন পাক সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার শিঘ্র ও লে. কর্নেল ফাতেমির সঙ্গে এবং এই বৈঠকেই ফকা চৌধুরী প্রণয়ন করেন বাঙালি নিধনের নীলনকশা। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ থেকে এই নির্দেশনার সূত্রধরে পাক সেনাবাহিনী বাঙালি নিধন অভিযান শুরু করে।

আমি প্রথম পর্বের দুই নাম্বার অধ্যায়ে এই বলে শুরু করেছিলাম যে, ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল নুতন চন্দ্র সিংহ কে হত্যা করা দিয়ে দিয়ে যদি সাকার খুনী জীবন শুরু করা যেত, তবে নিজেকে সামান্য তম হলেও প্রবোধ দেয়া যেত এই ভেবে যে, সাকা পশুটি আগে মানুষ ছিলো । কিন্তু সাকা তার মানুষ হবার ধাপ গুলো হারিয়েছে পারিবারিক আবহ আর তার পশু বাবা ফকা চৌধুরীর জীবনের রস আস্বাদন করে করে । সাকার কথা বলতে এসে এই যে এত শীবের গীত গাইলাম তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো সাকার পারিবারিক কাঠামোর সাথে, চিন্তা ও চেতনার সাথে আপনাদের জানানো যাতে করে আপনাদের এই নরপশুটিকে ভুল না হয় । তারপরেও সাকার পারিবারিক জীবনের এই কান টানা টানি অনেকের মন পিঞ্জিরে আবেগ ও দুঃখ স্রোত হয়ে আমার মন মগজ পিঞ্জিরে বার বার প্রশ্ন করে যাচ্ছে এবং আমি এই আবেগ দেখে যারপরনাই অভিভূত !

১৯৭১ সালে্র ১৩ই এপ্রিল সাকাচৌ তার পশু জীবনের একটি নতুন রূপ রেখা আমাদের সামনে তুলে ধরে যে , সাকা আসলে “শুধু” পশু না । জন্ম ও পরিচয়হীন ভাগাড়ে জন্ম নেয়া একটি বিভতষ ও হিংস্র পশু । ২০ বেলুচ রেজিমেন্টের নেতৃত্ব দেয়া মেজর শরাফত চারটি ট্যাঙ্ক ও এক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে শ্রী কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয় চত্বরে প্রবেশ করে । সৈন্যদের সাথে পশু সাকা ও আর কিছু রাজাকারো সেখানে গাড়িতে করে আসে । কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয় সমগ্র গহিরা,রাউজানে মানুষের উপকারে নিয়োজিত ছিলো মূলত তাদের দাতব্য কর্মকান্ডের জন্য । এছাড়াও বাবু নুতন চন্দ্র সিংহএর তত্বাবধানে সেখানে কুন্ডেশ্বরী বিদ্যাপীঠ স্থাপিত হয় যেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব ছেলে মেয়ারাই পড়তে আসত । আগেই বলেছি, নুতন চন্দ্র সিংহ ছিলেন সেখানকার অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যাক্তি । মানুষের জন্য ওই অঞ্চলে তার অবদান ছিলো প্রবাদের মত । গ্রামের লোকেরাও এই কুন্ডশ্বরী ঔষধালয়ে বিভিন্ন ভেষজ় গাছ গাছড়া যোগার করে দিয়ে কিছু টাকা উপার্জন করতেন । দেশ ভাগের পর অনেক হিন্দুই দেশ ছেড়ে চলে গেলেও নুতন চন্দ্র সিংহ থেকে যান দেশের টানে আর মানুষের টানে ।২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর প্রায় ৪৭ জন অধ্যাপক সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছিলেন কুন্ডেশ্বরী ভবনে । তাঁদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, ড. এ আর মল্লিক, ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখ। পাকবাহিনী চট্টগ্রাম দখলের পর এরা সবাই ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান । বাবু নূতন সিংহকেও যাওয়ার কথা বলেছিলেন সবাই । উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি মরতেই হয় দেশের মাটিতেই মরবো।’ পরিবারের সবাইকে সরিয়ে দিয়ে নিজে কুন্ডেশ্বরী মন্দিরে অবস্থান করছিলেন। পাকসেনা আসতে পারে অনুমান করে উঠানে চেয়ার-টেবিলও সাজিয়ে রেখেছিলেন ।নতুন চন্দ্র পাক সেনাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে কুন্ডশ্বরী ঔষধালয় এবং সংলগ্ন কলেজের কর্মকান্ড ঘুরিয়ে দেখান এবং তাদের কাজকর্ম ব্যাখ্যা করেন । মেজর শরাফত নতুন চন্দ্র সিংহএর সমগ্র প্রতিষ্ঠান এবং তার বিদ্যাপীঠের কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট হয়ে তার সব সৈন্য বাহিনী নিয়ে চলে যাবার জন্য ওঠে । কিন্তু সাকা চৌধুরী মেজর শরাফতকে জানায় তার বাবার কাছে খবর আছে যে নতুন বাবু এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছেন,খাওয়া দাওয়া সরবরাহ করছেন । একে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত ঝুঁকি পূর্ণ । এর পরেই মেজর শরাফতের হুকুমে বাবু নূতন চন্দ সিংহ কে তিনটি গুলি করা হয় যার একটি তার বাম চোখের নীচে লাগে ,একতি লাগে বুকে আরেকটি বাম হাতে । পশু সাকা তার বাবার ইচ্ছা তার পশু বাবার প্রতিদ্বন্দীর মৃত্যূ নিশ্চিত করতে এই ৭০ বছরের বৃদ্ধের বুকে আরো কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে । এই খবর দাবানলের মত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং গহিরা ও রাউজানের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক শোকের ছায়া নেমে আসে । ১৩ ই এপ্রিল ওই একই সৈন্য বাহিনী নিয়ে সাকা ও তার দলবল গহিরার আরেক বিশিষ্ট অধিবাসী চিত্তরঞ্জন বিশ্বাসের বাড়ী গিয়ে তার উপর অকথ্য নির্যাতন চালায় তার ছেলে দয়াল হরি বিশ্বাস কে বের করে দিতে, এবং চালের ড্রামে লুকায়িত হরি বিশ্বাস কে তার বাবার সামনেই বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় । এখানেও একটি তথ্য দেয়া প্রয়োজন যে, ভোটের সময় প্রকাশ্যে এই ছাত্র নেতা ফকা’র বিরুদ্ধে প্রচারণায় নেমেছিলো ।ওই একই দিন সাকা পাকবাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে রাউজানের প্রায় দুশ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে । এর দুদিন পর ১৫ এপ্রিল সাকা আবারও এক প্লাটুন পাক সৈন্য সহযোগে রাউজানে অভিযান চালায় । নোয়াপাড়া ইউনিয়নের পথের হাটের আওয়ামী লীগ কর্মী হানিফের বাড়িতে ঢুকে তাকে হত্যা করে । জ্বালিয়ে দেয় জহুর আহমেদ চৌধুরীর জামাতা ও নোয়াপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সম্পাদক ইজহারুল চৌধুরীর বসতবাড়ি । এছাড়াও ওই দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ভিপি আবদুর রব এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের শ্রমমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরীর পুত্র ছাত্রলীগ নেতা খালেদকে ধরে এনে সাকার নির্দেশে হত্যা করা হয়। এরপর সাকার নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী ঊনসত্তর পাড়ায় প্রবেশ করে ১৭০ জন নারী-পুরুষকে একটি পুকুর পাড়ে জড়ো করে হত্যা করে। সাকা সঙ্গী সেনাদের জানিয়েছিলেন, এরা সবাই মালাউন এবং ভোট দিয়েছে আওয়ামী লীগে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সাকাদের গুড হিলের বাসা ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান নির্যাতন কেন্দ্র ।১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারী প্রকাশিত দৈনিক বাংলায় একটি রিপোর্টে সাকা চৌধুরীর যুদ্ধবিরোধী কর্মকান্ড প্রকাশিত হয়, “সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী শত শত যুবকদের ধরে এনে চট্টগ্রামে তাদের গুড হিল বাংলো-তে নিয়ে আসতো এবং তাদেরকে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করতো। সেইসব হতভাগ্য লোকদের মধ্যে ছিলেন শহীদ ডাঃ সানাউল্লাহ্র পুত্র। ১৯৭১ সালের ১৭ই জুলাই সাকাচৌ ছাত্রনেতা ফারুককে ধরে আনে এবং পাকিস্তানী সেনাদের সাহায্যে তাকে হত্যা করে ।
“একাত্তরের জুলাইয়ে আমি, মুক্তিযোদ্ধা জুনু পাগলা, সৈয়দ ওয়াহিদ ও মিরাজ নগরীর হাজারী লেনের একটি পোড়া বাড়িতে বসে বৈঠক করছিলাম। সাকা এ খবর পেয়ে সাঙ্গপাঙ্গদের দিয়ে পুরো বাড়ি ঘেরাও করে আমাদের বন্দি করে গুডস হিলে নিয়ে যায়। টানা ১৪ দিন আমাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। গুডস হিলে বন্দি ছিল আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা। নির্যাতনের ফলে ওষ্ঠাগত বন্দিরা পানি খেতে চাইলে সালাহউদ্দিন কাদের প্রস্রাব করে মুক্তিযোদ্ধা তা পান করতে বাধ্য করত।”। সাকা ও তার পিতা ফজলুল কাদের (ফকা) এর গুড হিলসের টর্চার চেম্বারে নির্যাতিত রয়টার্সের সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন নির্যাতনের এরকম বর্ননা দিয়েছেন।

“গুডস হিলের নির্যাতন কক্ষে ছিল একটি টেবিল। ওই টেবিলের ওপর গাঁথা ছিল তিন ইঞ্চি মাপের অসংখ্য পেরেক। আর বন্দিদের সেই পেরেকের ওপর শুইয়ে ওপর থেকে কাঠের তক্তা দিয়ে চেপে ধরা হতো। ফলে বন্দিদের সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে পড়ত।মৃ্ত্যু পর্যন্ত অপেক্ষাই ছিল তাদের ভবিতব্য।” আরেক নির্যাতিত ফজলুল হক সওদাগরের ভাষ্য।

সাকা চৌধুরী, তার পিতা ফকা চৌধুরী ও তার সহযোগীরা চট্টগ্রামে তাদের ‘গুডস হিলে’ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন ও হত্যা করেছে। এমনকি অনেক মেয়েদেরও তারা ধরে এনে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে তাদের মনোতুষ্টির জন্য । ১৯৭১ সালের মে থেকে নভেম্বর – দীর্ঘ সাত মাস সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম শহরের গুডস হিলে তার বেসরকারি জল্লাদখানা পরিচালনা করে। প্রতিদিন চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বা তাদের আশ্রয়, চিকিৎসা, ওষুধপত্র ইতাদি দিয়ে সহায়তাকারী বলে যাদেরই সন্দেহ করা হতো তাদের ধরে এনে গুডস হিলের এই ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো-প্রতিদিনই দুই-একজনকে হত্যা করা হতো এবং তাদের লাশ রাতে কারফিউ চলাকালে গাড়িতে করে নিয়ে কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দিয়ে আসা হতো ।

১৯৭২ সালের ২৯ শে জানুয়ারী মুজিব সরকারের সময় নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিলো । নূতন চন্দ্রের ছেলে সত্যরঞ্জন সিংহসহ মোট ১২ জন সাক্ষী ছিলেন মামলায় ।মামলাটির ক্রমিক নম্বর ছিল ৪১(১)৭২ এবং ৪৩(১)৭২ । মামলার এফআইআর নং ইউ/এস/৩০২/১২০ (১৩)/২৯৮ বিপিসি/। ৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি বিচার শুরু হয়। আসামিদের মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ পলাতক ছিল ৫ জন । পশু ফকা চৌধুরীসহ ৫ জন ছিল কারাগারে।ফকা অবশ্য এই মামলার কারনে ধরা পড়েনি, ১৯৭১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ১০২ কেজি সোনা ও সাত লক্ষ টাকা নিয়ে আনোয়ারা দিয়ে একটি ট্রলারে করে বার্মা সীমান্তে পালাবার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে জাঙ্গিয়া পরা অবস্থায় ধরা পড়ে এবং তাকে অমানুষিক ভাবে মারধোর করবার পর পুলিশে সোপর্দ করা হয় ।জেলে থাকা অবস্থাতেই পশু ফকার, পশু যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং পশুটি এই ধরাধাম কৃতজ্ঞ করে পটল তোলে ।
১৯৮৩ সালে সত্যরঞ্জন সিংহ মৃত্যুবরণ করায় এবং ইতিমধ্যে সাকা আবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে প্রতাপশালী হয়ে উঠলে এবং পশুটির ক্রমাগত হুমকির কারনে পরিবারটি মামলা চালানো থেকে বিরত থাকে ।

( সামনের পর্ব গুলোতে আমি সাকার রাজনৈতিক পোল্টিবাজি, বংগবন্ধুর পরিবারের সাথে তার অন্তরংগ স্মপর্কের কথা, তার বিভিন্ন সময়ে দেয়া বিভিন্ন ব্যাঙ্গাত্নক ও ঔদ্ধত্বপূর্ণ মুখ নিঃসৃত বর্জ্য,বর্তমান সময়ে তার সকল কর্মকান্ড, চট্রগ্রামে তার রাজনীতি করবার পদ্ধতিগুলো,পত্রিকায় তার নিজেকে প্রমোট করবার পদ্ধতি,চোরাচালানীর কিছু চমকপ্রদক তথ্য,বর্তমান রাজনীতিতে তার টিকে থাকবার কৌশল,তার আন্তর্জাতিক গডফাদার, তার শক্তির উতস , সাকার পূত্র,কন্যা ও স্ত্রী’র হাল হকিকতসহ অন্য সকল বিষয় নিয়ে বিস্তারিত লিখার চেষ্টা করব । আশা করছি আপনাদের সাকা পাঠ ঘৃনায় ঘৃনিত হয়ে উঠছে …)

চলবে…

“সাকা” একটি পশুর নাম (পর্ব-২)

imagesএই পর্বটি খুব একটা বড় করে লিখতে পারিনি নিজস্ব ব্যাস্ততার কারনেই । প্রতিটি তথ্য বার বার করে ভেরিফাই করে এবং তথ্য সূত্র গুলোর থেকে বার বার না লিখবার অনুরোধ, আমাকে অনেকটা দ্বিধাগ্রস্থ করে তুলেছিলো । এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমি অন্তঃত পক্ষে কথা বলেছি রাউজান,গহিরা,রাঙ্গুনিয়া,ফটিকছড়ি এবং চট্রগ্রামের অন্যান্য এলাকার কমপক্ষে ষাটজন মানুষদেরও উপরে । তথ্য সংগ্রহ করেছি ইন্তারনেট থেকে, ব্যাক্তিগত মেইলে,টেলিফোনে,পত্রিকা এবং অন্যান্য ব্যাক্তিগত সূত্রে । সবচাইতে মজার ব্যাপার হচ্ছে, যখনই কেউ জানতে পারলো এই তথ্যগুলো নেয়া হচ্ছে ব্লগে সাকা পশুটিকে নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করবার জন্য তখনই আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, সবাই কেমন করে যেন পিছিয়ে যাচ্ছেন । একজন তো বলেই বসলেন, ভাই এতক্ষন যা বলেছি তা ফাজলামি করলাম, আর আমার নাম আসলে ***** এইটা না । তারপর হঠাত করেই, “ভাই বাদ দেন । এসব লিখে কি হবে ?” এই জাতীয় কথা বলা শুরু করলেন । আমার গোঁ দেখে তিনি শেষ পর্যন্ত আসল কথা বলেই বসলেন, “ভাই প্লিজ আমার নাম টা ব্যাবহার করবেন না । বুঝেনই তো, আমাকে চিটাগাং ফেরত যেতে হবে ।”

আমি এইসব শুনে হতাশ হই । ভেতরটা কি এক কষ্টে পুড়ে খাক হয়ে যেতে থাকে । এই ভয় আর এই আতংক লন্ডনে এসেও তাদের দুদন্ড শান্তি দেয় নি । সাকা এমনই এক পশু । এমনই তার দাপট । কি এক অজানা ক্রোধ আমাকে চেপে ধরে । জানিনা শরীরে আগুন লেগে গেলে কি হয় । আমার ভেতরের তাপ যেন ক্রমাগত বাড়তেই থাকে । শুধু এইটুকু টের পাই, একজন মানুষ হয়ে সাকা নামের পশুটিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি প্রতিটি মুহূর্তে ক্লান্ত হই…শ্রান্ত হই ।

প্রথম পর্বের পর –

চিকদাইর ইউনিয়নের ফল্লাতলী থানার মেয়ে ছিলো সুলতানা । গরীব ঘরের হওয়ার কারনেই ভাগ্য পরিবর্তনের তাগিদে মানুষের বাসাতে কাজ করতে হতো সুলতানাকে । ওই গ্রামেরই আরেক ভদ্রমহিলা আশ্রাফুন্নেসা , যিনি ফকা চৌধুরীর বাসাতে প্রায় দশ বছর ধরে কাজ করেছিলেন, তারই সূত্র ধরে সুলতানা কাজ করতে আসেন ফকার গহিরার বাড়ীতে । ফকার স্ত্রী’র (যাকে মনু নামে ডাকা হতো কেতাবি নাম জানা যায়নি) শারীরিক সমস্যাজনিত কারনে তাদের বিয়ের প্রথম দশ বছরেও কোনো সন্তান হয়নি । এই নিয়ে অবশ্য কোনো ধরনের পারিবারিক অসন্তোষ না থাকলেও, সুলতানার সাথে ফকার শারীরিক সম্পর্কের কথা নিয়ে ফকার পুরো পরিবারেই একটা কানা ঘুষা চলতে থাকে ।

মূলত ফকার রক্ষিতা হিসেবেই সুলতানাকে ব্যাবহার করা হতো । ওই সময়ে পারিবারিক এই ধরনের ব্যাপারগুলো মূলত প্রতিরোধের থেকেও, দ্রুত চাপা দেওয়ার চেষ্টা চালানো হতো । আর ফকা অবস্থানগত ও সম্পদগত দিক থেকে এতটাই শক্তিশালী ছিলো যে,ফকা যদি তার স্ত্রী্র সামনেও কাউকে ধর্ষন করত তাহলেও আসলে কিছু করার ছিলো না । সে সময় রাজনৈতিক ভাবেও ফকা একটি শক্তিশালী অবস্থানে দাড়িয়েছিলো । সুলতানার গর্ভে সন্তান আসার পর তা আর গোপন থাকেনি । এই ধরনের খবর গুলোর যে অদৃশ্য পা থাকে, সে পায়ের জোরেই খবর গুলো বেশ চাউর হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পরে । কিন্তু ফকার যে অবস্থান গত শক্তির কথা আগেই বলা হয়েছে, তার জোরেই এই ধরনের খবরগুলো আসলে ঠিক ফকার মত লোকদের জন্য থামিয়ে দেয়া খুব একটা কঠিন হয় না ।

সুলতানার সন্তান জন্ম নেওয়ার পরের সাত মাসেও সুলতানাকে ফকার বাসাতেই দেখা যায় । এবং একটা পর্যায়ে ছড়ানো হয় যে সুলতানা, ফকার বাসায় থাকা রাখাল হাবিবের সাথে চুরি করে ভারতে পালিয়েছে । এবং সুলতানার গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তান আসলে হাবিবেরই ফসল । কতটা হাস্যকর হলে এই যুক্তি দেয়া যায় যে, ফকার মত প্রভাবশালী লোক এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেয় নি । হাবিব আর সুলতানাকে আর কখনোই কোথাও দেখা যায়নি কিংবা খুঁজে পাওয়া যায়নি । বলা হয়ে থাকে, সুলতানা ও হাবিবের কবর ফকার বাড়ীর চৌহদ্দীর ভেতরেই দেয়া হয়েছিলো ।

সবচাইতে চমকপ্রদক তথ্যটা হলো, সুলতানার পরিবার থেকেও আর কোনো রকম প্রতিবাদ কিংবা পদক্ষেপের কথা কখনই শুনা যায়নি , আর দশটা সাধারণ হারিয়ে যাওয়া মানুষের মতন সুলতানাও কখনো ফিরে আসেনি । আর হাবিবের ব্যাপারটা আরো বেশী সহজ সাধ্য ছিলো, কেননা বাবা-মা মরা এতিম ছেলে খুব ছোট বেলা থেকেই ফকার বাসাতেই বড় হয়েছিলো । সুতরাং সে হারিয়ে গেলেও কারো হয়তবা কিছু যায় আসে নি । এর মধ্যেই মোটামুটি চাউর করে ঘোষনা করা হয় সাকার জন্মের কথা । চোধুরী পরিবারের প্রথম ছেলে সন্তানের কথা ।

পারিবারিক ভাবে ফকার পরিবারে এই মিথটিই প্রচলিত যে, সাকা আসলে সুলতানার গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তান । ( এই ঘটনা এবং ব্যাবসায়িক ও সম্পত্তির মালিকানা সঙ্ক্রান্ত অন্যান্য আরো কিছু ঘটনার সূত্র ধরেই এখন সাকার আরো দুই ভাই, গিয়াসুদ্দিন কাদের চৌধুরী ও সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে সাপে নেউলে সম্পর্ক চলছে । যা আপনাদের পরবর্তী পর্ব গুলোতে বিস্তারিত বলা হবে) আগেই বলে নেয়া প্রয়োজন, এই ধরনের তথ্যগুলোর সবচাইতে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ঠিক প্রমান সহ কোনো ধরনের দলিল দস্তাবেজ থাকেনা । কিন্তু আমি যার কাছে সাকার পারিবারিক ও ভেতরকার কীর্তিকলাপ গুলোর খোঁজ খবর নিয়েছি তার তথ্য সূত্র আমার কাছে বরাবরি অথেন্টিক মনে হয়েছে । সাকার পরিবারকে তিনি ছোট বেলা থেকেই খুব কাছ থেকে দেখেছেন । সুতরাং পারিবারিক এইসব ঘটনাগুলোর অনেক কিছুরই সাক্ষী তিনি ।

একটা সময় ফজলুল কাদেরের ভয়ে ও দাপটে একটা জীবন অতিবাহিত হলেও আজ সন্তানদের সুবাদে লন্ডনে স্থায়ী ভাবে বাস করছেন । বার বার তিনি আমার কাছে তার নাম না প্রকাশ করবার শর্তে অনেক গল্পই করেছেন , যা শুনে এই নিরাপদ একটি দেশেও আমি ঘেমে উঠেছি বার বার । আতংকে চমকে উঠেছি । আপনাদের একটি কথা এখন না বলেই নয় যে, প্রায়ই কথা উঠে থাকে, সাকা চৌধুরী লন্ডনে ১৯৭১ সালের মহান যুদ্ধে দেশেই ছিল না । পশুটি নাকি ছিল লন্ডনে । সেখানে সে নাকি লিঙ্কন্স ইন থেকে আইন বিভাগে পড়াশোনা করেছে এবং ব্যারিস্টার ডিগ্রী অর্জন করেছে । এই একটি মাত্র তথ্য জানতে আমাকে কয়েকবার চ্যান্সারি লেনের লিঙ্কন্স ইনে দৌড়াতে হয়েছে । কারো ব্যাক্তিগত তথ্য যেহেতু লিঙ্কন্স ইন অথরিটি দেয়না সুতরাং আমাকে এক্ষেত্রে অন্য একটি পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছে । প্রথমেই বলে নেই যে, লিঙ্কনস ইন আইন বিষয়ে কোনো সাবজেক্টের কোনো ধরনের টিউশন দেয়না । লিঙ্কন্স ইন একটি অনারারী সোসাইটি যারা বার-এট-ল করছে এমন ছাত্র-ছাত্রীদের মধাহ্ন এবং নৈশকালীন ভোজনের ব্যাবস্থা করে এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে সেসব ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যারিস্টার হিসেবে ঘোষনা করে । বার এট ল কোর্স সম্পন্ন করতে হলে বাধতামূলকভাবে চারটি অনারারী ইনের যে কোন একটি ইনের সদস্য হতে হয় , এবং লিঙ্কন্স ইন সে সবের মধ্যে একটি ।

সুতরাং প্রথম ক্ষেত্রেই এটা খুব পরিষ্কার যে, সাকা কোনভাবেই লিঙ্কন্স ইন থেকে আইন বিষয়ে পড়েনি এবং এখান থেকে ব্যারিস্টারও হয়নি । ১৯৫০-২০০০ সালের যে লইয়ার্স লিস্ট, যা কিনা লিঙ্কন্স ইন এবং আরো তিনটি এইরকম অনারারী প্রতিষ্ঠানের সূত্র ধরে প্রকাশিত হয় একটি বই আকারে, সেখানে সাকার নাম পাই নি । আমাদের আরেক পোল্টিবাজ নেতা মওদুদ আহমেদ,শফিক আহমেদ,রফিকুল হক মিয়া প্রমুখের নাম পেলেও দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে সাকা নামের পশুটির নাম খুঁজে পেলাম না ।

যে কথা শুরুতেই বলছিলাম যে সাকার মত একটি নির্লজ্জ আর নির্মম পশুটির এখনকার কর্মকান্ডের পেছনে তার শৈশবের ইতিহাস জানা আমার কাছে খুব জরুরী মনে হয়েছে । সম্ভবত সাকা তার এই জন্মের ব্যাপারটি খুব স্বাভাবিক ভাবেই জানতে পেরেছিলো খুব অল্প বয়সেই , যার সাথে সাথে পরিচিত হয়েছিলো তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভয়াবহ রকমের হিন্দু বিদ্বেষের সাথে ,। রাউজান,গহিরা,রাঙ্গুনিয়ার মূলত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ছিলো । এখনো প্রচুর পরিমাণে হিন্দুদের বসবাস ওইসব এলাকা গুলোতে । ছোটবেলা থেকেই কঠোর ধর্মীয় অনুশাষন তথা ধর্মের নামে বাড়াবাড়িরই শিক্ষা দেয়া হয়েছিলো । ফকা চোধুরী্র প্রচন্ড শাষন আর বাড়াবাড়ি রকমের নিয়ম কানুনের মধ্যে দিয়ে তার জারজ সন্তান সাকা ধীরে ধীরে বিগড়ে যেতে থাকে ।

(চলবে) —

“সাকা” একটি পশুর নাম (পর্ব-১)

images

লেখাটা লিখতে গিয়ে টের পেলাম অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে । অনেক বড় মানে, বেশ বড় । এই পশুকে নিয়ে এত বড় লেখা পাঠকরা কেন, লেখক হিসেবে আমি নিজেই হজম করতে পারছিলাম না । সুতরাং জীবনে এই প্রথম বারের মত পর্ব হিসেবে লেখা দিতে হচ্ছে । আশা করি আপনারা এই নরপিশাচের কথা জেনে শিউরে উঠবেন । ঘৃণায় আর লজ্জায় মুখ লুকাবেন । কেননা সাকা’র মত পশু আজ নিজেকে মানুষ দাবী করে সমাজে দাবড়িয়ে বেড়ায় । সে কারনেই সম্ভবত আমার মত সাধারণ পাবলিকের আর নিরীহ হয়ে থাকা গেলো না । সাকার মত একটু হিংস্র হতেই হলো ।
আপনাদের সাকা পাঠ ঘৃনার হোক । এই কামনা ।

********
শুরুর ক্যাচালঃ

কবি মলাগোফরুমার একটা ছড়া পড়েছিলাম অনেক আগে । উতসর্গ পত্রে ছিলো সাকার নাম । উতসর্গ পত্রে “সাকা” নামটা দেখে তখন বুঝি নাই । বেশ অবাক লেগেছিলো । কিন্তু পড়ার পর এই চারটি লাইন তখন বুয়েনো চকলেটের মত মনে অসাধারণ মনে হয়েছিলো । ছড়াটি এইরকম-
ছোট্ট বেলায় শুয়োর দেখে ,
হাতের মুঠো একে একে,
জড় হয়ে যেত ।
পোকার মত তোকে যদি,
পিষে ফেলা যেত !!

পাঁচটি বাক্যের এই কথাগুলো ঠিক নিজের মনের কথা বলে মনে হয় । প্রতিটি দিনেই স্বপ্ন দেখি, এই পশুটিকে যদি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেতো ! যদি মানুষের সামনে তার বিষমুখ আর বিষ দাঁতগুলো ভেঙ্গে দেয়া যেতো ! আফসোস, এ সমাজ বড়ই অদ্ভুত সমাজ । এখানে মানুষ কে পিষে মারা হয়, পশুকে নয় ।

এক

সাকা নামের নরপিশাচটিকে নিয়ে কথা বলবার আসলে কোন রুচি অথবা ইচ্ছা কোনোটাই আমার ছিলো না । ধানমন্ডির ৮/এ এর ৪৮ নম্বর বাসার সামনে অথবা রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন এলাকার কাদের নগরের প্রধান ফটকের সামনে বড়জোর এক দলা থুথু দিয়েই আমি আমার ঘৃণা প্রকাশ করতে পারতাম । অনেকের অগোচরে এইসব ঘৃণা প্রকাশ করে বাসায় গিয়ে দু’দন্ড শান্তিতেও হয়তবা ঘুমানো যেত । ফেইস বুকে খোলা যেত “SAY NO TO SAKA” টাইপ কয়েকটা গ্রুপ কিংবা হাজার খানিক এড্রেসে মেইল করে কিছু খিস্তি-খেউর পৌছে দেয়া যেত সাকা কে উদ্দেশ্য করে । তাতেও চলত । কি লাভ হতো কিংবা কি হতো না তা হয়ত সেসব ক্ষেত্রে আর বিচার করতামও না । কিন্তু কেন যেন নিজেকে প্রবোধ দেবার মত কিছু একটার বড় প্রয়োজন পড়ল । মানুষ হয়ে জন্মাবার এই বুঝি ব্যার্থতা । নিজে যতটাই দূর্বল আর সংকুচিত হই না কেন, এই রকম একটা পুঁজ শরীরে দেখেও না দেখার ভান করতে পারি না । তাই সাকা সম্পর্কিত মোটামুটি সব তথ্যই আমাকে যোগাড় করতে হলো । এই পশুটির সম্পর্কেও জানতে হলো অনেক কিছু । গত এক সপ্তাহে এই পিশাচটিকে নিয়ে যতটুকু জেনেছি, তার কিছুটা বলতে পারলেও, পাঠক, আপনারা কষ্টে আর লজ্জায় মুখ লুকাবেন, দুঃখে চৌচির হবেন আর লজ্জায় আর গ্লানিতে বোধশুন্য হবেন । সাকার মত একটি পশু বাংলাদেশ নামের স্বাধীন আর সার্বভৌম রাষ্ট্রে কি করে থাকে এ এক অপার বিষ্ময় ! শুধু মাত্র এই একটি পশু এই দেশের নাগরিক, শুধু এই কারনটিতেই যদি বাংলাদেশকে কখনো “ব্যানানা রিপাব্লিক” কিংবা “ব্যার্থ রাষ্ট্র” ট্যাগে যদি ট্যাগায়িত হতে হয়, আমি অবাক হবো না । এই পশুটির অংভঙ্গি, উচ্চারণ, দাম্ভিক কটুক্তি, হায়েনার মত এক ধরনের বিরল প্রজাতীর হাসি,মুখ নিসৃত বর্জ্য , সবকিছুর মধ্যেই যেন একটি ভয়াবহ নোংরামির আভাষ থেকেই যায় । রাজনৈতিক নেতারা একজন আরেক জনের উপর সামান্য কথাতেও ঝাপিয়ে পড়েন । মওদুদ সাহেব তো কথায় কথায় আগে মান হানির মামলা করতেন, সেই মওদুদকে সুবিধাবাদী,চশমখোর বলেও সাকা মান হানির এলিগেশন থেকে রক্ষা পেয়ে যায়, শেখ হাসিনা কে যখন সাকা বলে, “ ওয়াজেদের কি সোনা নাই ? আমার সোনা নিয়ে টানাটানি কেন ?” কিংবা “ শেখ হাসিনার বাসর রাতের শাড়ি তো আমার কিনে দেয়া” অথবা, “ হাসিনা তো আমার উপর একটু দুর্বল, ওনার সাথে আমার বিয়ে হবার কথা ছিলো কি না…” সে সময় আওয়ামীলীগের চেলারা কই থাকে ? তারা তো “রাজাকারের ছেলের বিয়ে হয়েছে শেখ হাসিনার মেয়ে পুতুলের সাথে” এই তথ্য শুনে আমার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে পোস্ট দেয়, ডিভাইন ইন্টারভেনশন আর জংলীদের জংলা নৃত্য দেখা যায় । কোন কোন শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আমাকে আবেগের ব্যাবসায়ী বানান, প্রিয় মানুষগুলো বলেন , “নিঝুমের তো আপ্রোচ ঠিক নাই”, কেউ কেউ আবার “হারানো রাস্তা” হয়ে আমার কথার সত্যতা জানতে চান । কিন্তু কি এক অজানা ভয়ে সেইসব আওয়ামী প্রেমীরা সাকা’র ক্ষেত্রে নিরব আর ম্রিয়মান থাকেন । কই থাকে তাদের সব রেফারেন্সের ভান্ডার ? আওয়ামী নেতারাই বা কই থাকেন ? কেন সাকার বিচার হয় না ? কেন সাকার মত একটা নরকের কীট, একটা বিভতস পোকা, একটা হিংস্র পশুকে সব সরকার ছেড়ে দেয় ? খালেদার চেলারা কই থাকে, যখন খালেদাকে “কুকুর” বলে গালি দেয় ? তারেকের হম্বি তম্বি তখন কই থাকে ? মামুন আর তার পাওয়ার চোদায় না কেন ? খালেদার জাতীয়তাবাদী হ্যাডম তখন কার পুচ্ছদেশ দিয়ে কার রস আস্বাদন করে ?

অবশ্য এসব পাতি চেলা আর নেতাদের জিজ্ঞেশ করে কি হবে ? যখন মাননীয় শেখ হাসিনাকে আগের রাতে গালিগালাজ করে পরের দিন ছেলের বিয়ের দাওয়াত দিতে সুধা সদনে ঢোকার পার্মিশন পায়,যখন খালেদা কে কুকুর ডাকার জন্য বিরোধীদলীয় উপনেতা বানানো হয় । যখন এই হয় সাকার পুরষ্কার, তখন আমার মত আবাল পাবলিকের আর কি করণীয় থাকে ? আমরা কেবল দাঁতে দাঁত চেপে ভিতরেই গুমড়ে মরি, জ্বলতে থাকি । কারন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্য কোন আইন নেই । আদালত নেই । অন্ততঃ সব সরকার আমাদের এই হজমি বড়ি খাইয়ে, ভালো করে বুঝিয়েই দিয়েছেন ।

দুই

আমি যদি ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল নতুন চন্দ্র সিংহ কে হত্যা করা দিয়ে শুরু করি, তাহলে হয়ত মনে হবে সাকার বর্নাঢ্যময় জীবন বুঝি ওই একাত্তরেই শুরু হলো । আপনাদের কাছে মনে হবে তার আগে এই পশুটি মানুষ ছিলো । এই রকম করে শুরু করা গেলে হয়ত আসলে ভালোই হতো । নিজেকে এতটা ক্লান্ত লাগতো না, যতটা ক্লান্ত হয়েছি গত একটি সপ্তাহে সাকার উপর তথ্য সংগ্রহ করে আর তার নির্মমতা আর পাশবিকতাগুলো জানতে পেরে । মানুষ হিসেবে এই বুঝি আমার দূর্বলতা । একটা মানুষ ঠিক কতটা পুঁতি গন্ধময় হলে তাকে অসভ্য বলা যায় কিংবা কতটা বিকট হলে তাকে পশু বলা যায় এই মাপকাঠির হিসেব আমার সাধারণ মজ্জায় ঢোকে না । আমি শুধু বুঝি সাকার কর্মকান্ডের এক লক্ষ ভাগের একটা ভাগ কেউ করে থাকলে , তাকে মানুষ সমাজেই রাখা সম্ভব না । অথচ সাকা পশুটি টিকে আছে বলীয়ান আর পরিপুষ্ট হয়ে তার আধিপত্য নিয়ে । যাকে বলে কি না বহাল তবিয়তে । কথিত আছে সাকার বাবা রাজাকার ফকার একাধিক রক্ষিতার কথা । রাঙ্গুনিয়ার সেই রক্ষিতা সুলতানার গর্ভে আসা সন্তান আমাদের আজকের সাকা । ফজলুল কাদের চোধুরী ওরফে ফকা, সেই সময়েই অবশ্য সুলতানাকে মাটিতে চাপা দিয়ে ফকা সেখানে টগর ফুল ফুটিয়েছেন বড় যত্নে । সাকার কথা শুরু করতে গেলে তার জন্ম, তার পারিপার্শ্বিক গুলো জানা খুব প্রয়োজন । কেননা তার এই নোংরামি আর পশুত্বের সূত্র গুলো জানা থাকলে সাকার পশুত্বের ব্যাপ্তিটা জানা অনেক সুবিধার হবে ।

(চলবে)

কৃষ্ণচূড়া

zscakc8buqca5xlaflca3t56rfcattsq8fcahm8su3cagkngbycafcqo8rca6s9wzdcaqj7ufacar42f7qca3bkb1jcas0vi7bcaz1xegkcaa54ym2cahir9f2ca2axnlqcazqqhzfcaybjo72

উতসর্গঃ আব্দুল্লাহ আল নূর তানিম । প্রিয় বন্ধুবরেষু…

এক.

রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে প্রচন্ড রকম পানির তৃষ্ণা হয় । বুক ফেটে যাবার মত সুতীব্র একটা যন্ত্রণা । বিছানা থেকে উঠে রান্না ঘরে যে যাব তাতেই খুব আলসেমি লাগে । এজন্য বেশীর ভাগ সময়ই টেবিলে একটা জগ আর গ্লাস রেখে দেই । কাল রাতে রাখা হয় নি । উঠে যে যাব তারও উপায় নেই । পুরো ঘর জুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার । এই ধরনের তীব্র অন্ধকারে আমার খুব ভয় হয় । আমাদের ড্রেপার্স স্ট্রীটে সাধারণত এমন অন্ধকার থাকে না । আমার জানালা থেকে খানিকটা দূরে ছোট পাব টার ঠিক সামনে বড় একটি নিয়ন বাতি সারারাত জ্বল জ্বল করে । ঘরের আলো বন্ধ করে দিলেও রাস্তার নিয়ন আলোটাতে সারারাত আলোকিত হয়ে থাকে ।মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ী হুস্ করে চলে গেলে এক মুহূর্তের জন্য একটু আলোর দেখা মেলে । তারপর আরো অন্ধকার । আর তাছাড়া আকাশ পরিষ্কার থাকলে চাঁদ না হয় তারা একটা না একটা থাকেই । গতকাল ইলেক্ট্রিসিটি কিনতে ভুলে গিয়েছিলাম । ইমার্জেন্সিও মনে হয় শেষ হয়ে গেছে । পাশের কিওস্কটাও বন্ধ হয়ে যাবার কথা । কোথায় যেন খুট খাট শব্দ হচ্ছে । রাত হয়ে গেলেই এই এক সমস্যা । চারিদিক থেকে নানান ধরনের শব্দ । দিনের বেলায় এই শব্দ গুলো সম্ভবত রাত হবার জন্য অপেক্ষা করে । রাতের এই অজানা শব্দ গুলোর সম্ভবত কোনো সম্মোহনী ক্ষমতা আছে । চাইলেও কান থেকে যেতে চায় না । একদিক থেকে ভালই । রাতের নিস্তব্ধতা বলে যে ব্যাপারটা আছে তা নিমিষেই হারিয়ে যায় । ঘরে আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন মানুষ থাকবার কথা না । সুতরাং শব্দ কোথথকে আসছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । খুব স্পষ্ট একটা শব্দ । মাথা তুলে যে উঠব সে উপায় নেই । মাথায় অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে । ভোঁতা ধরনের যন্ত্রণা । সেল ফোন টা অন করলে হয়ত কিছুটা আলোর দেখা পেতে পারি । তাও অন করতে ইচ্ছা করছে না । অন করলেই দুনিয়ার সব ঝামেলা এসে একসাথে হবে । কয়দিন ধরে বন্ধ আছে সেলটা ? পনেরো দিন তো হবেই । এরি মধ্যে নিশ্চয়ই দেশ থেকে গোটা বিশেক মেসেজ আসবার কথা । ভুল উচ্চারনে ছোটচাচার ভয়েস মেল থাকবার কথা । “ বাবা রাশেদ, আর্ঝেন্ট দরকার , ফোন করিও ।” চাচার “আর্ঝেন্ট” শব্দটা শুনলে মনে হতে পারে কয়েক মিনিটের মধ্যে ফোন না করলে তিনি হয়ত মারা যাবেন । এজন্য প্রথম দিকে সাথে সাথেই ফোন করতাম । এখন আর করি না । এক মাস পরে করলে যে কথা একদিন পরে করলেও সে একই কথা । চাচার প্রয়োজন মানেই হচ্ছে কিছু পাউন্ড পাঠানোর কথা । ব্যাবসা করবেন । গত আট বছরে তিনি অনেক ধরনের ব্যাবসা করলেন । একবার করলেন ফোন ফ্যাক্সের ব্যাবসা । সেটা নাকি সেসময় হট কেক । চাচার ভাষ্য অনুযায়ী , “বুঝলা বাবা ? পাবলিকের কাজ হইলো কথা বলা । সে তো তা বলবেই । তুমি আটকাইবা কেমনে ? যে যুগ পরসে , তাতে অলিতে গলিতে প্রেম পিরিতি । পোলাপান তো বাসায় কথা বলতে পারে না । ” আমার এধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত ফোনের এপাশ থেকে খুব নিরব একটা দীর্ঘঃ শ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না ।

চাচার কাছে আমাদের কিছুটা ঋণও আছে । আমার বাবা–মা বছর বিশেক আগে একটা রোড এক্সিডেন্টে মারা যান । আমার আর আমার ছোট বোনের বয়স তখন অনেক কম । ছোট চাচার কাছেই আমাদের বেড়ে উঠা । চাচার কোন সন্তান ছিল না । এই নিয়ে চাচাকে আমি কোনদিন দুঃখিত হতেও দেখিনি । আমার ধারনা ছিল টাকা-পয়সার চিন্তা ছাড়া চাচা আর কিছুই চিন্তা করতে পারেন না । আমার ছোট বোন প্রিয়তি কে যেদিন তার শ্বশুর বাড়ীতে তুলে দিলাম আমার কাছে কেন জানি পৃথিবীর সব ধরনের দায়িত্ব থেকে মুক্ত মনে হয়েছিলো । সবাইকে খুব অবাক করে দিয়ে ছোট চাচা সেদিন ছোট বাচ্চাদের মত কেঁদেছিলেন অথচ প্রিয়তির প্রতি তার এই মমতা কখনোই বুঝতে পারিনি । তার কিছুদিন পর আমার ছোট চাচী কোন অসুখ বিসুখ ছাড়াই এক রাতে মরে গেলেন । আমি সেদিন খুব অবাক হয়েছিলাম । মৃত্যূ ব্যাপারটা কেমন জানি আমাকে কখনই কষ্ট দেয়নি । কিন্তু আমার মনে আছে , তাঁর মৃত্যর পর আমি অনেকদিন কারো সাথে কথা বলি নি । ছোট চাচী আমার বন্ধুর মত ছিলেন । বলতে গেলে আমি সবসময় তার সাথেই থাকতাম । ছোট চাচা প্রাথমিক ভাবে খুব কাতর হয়ে গেলেন । সারাদিন ফরিদা ফরিদা করে মাতম করেন । ও , বলাই হয়নি আমার ছোট চাচীর নাম ছিলো ফরিদা । চাচীর চল্লিশার ঠিক পনেরো দিন পরেই ভয়ানক রকম ফর্সা আর অনেক লম্বা এক মহিলাকে চাচা ধরে নিয়ে আসেন । আমার কাছে মনে হয়েছিলো উনাকে সম্ভবত ইউরোপের কোন দেশ থেকে ধরে আনা হয়েছে । আমার সাথে তার দেখা হতেই খুব কারন দর্শানোর ভঙ্গি নিয়ে চাচা বুঝালেন , বাবা রাশেদ , বয়স তো কম হইলো না । এই বুড়া বয়সে একজন দেখার লোক তো লাগে, কি বলো ? পারভীন অতি ভালো মেয়ে । এই বলে আমার সাথে নতুন চাচীর পরিচয় করিয়ে দিলেন । “ পারভীন, এ হইলো গিয়া আমার বড় ভাইয়ের পোলা রাশেদ । ভার্সিটিতে পড়ে ” আমার নতুন চাচী মানুষটা অদ্ভুত । খুব শান্ত শিষ্ট । সারাদিন গুন গুন করে একলা গান করেন । আমরা কেউ কাছে গেলেই সে গান থেমে যেত । ভদ্রমহিলাকে দেখে আমার সবসময় মনে হোত তিনি কোন এক কারনে সারাদিন আতংকিত থাকেন । আমার আর নতুন চাচীর মধ্যে একটা মিল লক্ষ্য করেছিলাম । আমার মত তিনিও প্রায়ই আমাদের কৃষ্ণচূড়া গাছটির সামনে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতেন । আমাদের বাসার সামনের খালি জায়গাটায় একটা বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিলো । আমার ঠিক মনে নেই কবে এই গাছ লাগানো হয়েছিলো । সম্ভবত বাবা মারা যাওয়ার আগে । এতটুকু মনে আছে , গাছের প্রতি বাবার প্রচন্ড একটা টান ছিলো । আমাদের বাসায় সে কারনেই অনেক গাছ । কিন্তু কি কারনে যেন এই কৃষ্ণচূড়া গাছটি আমাকে সব সময় টানত । শীতকালে গাছে যখন প্রচুর ফুল ফুটত , দূর থেকে মনে হতো আমাদের বাড়ীটিতে আগুন ধরে গেছে । এই গাছটির সাথে আমার কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পেতাম । সবচাইতে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে বাসার অন্য সব গাছ গুলোতে সারাদিন এত পাখির আনাগোনা অথচ আমাদের এই কৃষ্ণচূড়া গাছটিতে কোন দিন কি কারনে যেন কোন পাখি বসত না । আমার মনে হতো এই নিয়ে গাছটির দুঃখের সীমা ছিল না । তাই হয়ত গাছটির সাথে আমার খুব মিল খুঁজে পেতাম । আসলে আমরা দু’জনই ভীষন একা ছিলাম ।

দুই.

কম্পাস গ্রুপের এই বত্রিশ তলার উপরের অফিসটাতে আমি আগে কখনো আসিনি । বিশাল রিসেপশন । ঘরটার ইন্টেরিয়র যে কোম্পানী করেছে , তারা বেশ রুচিবান বোঝা যাচ্ছে । ঘরটাকে কেমন যেন সমুদ্রের মত লাগছে । হালকা নীল একটা আভা চারিদিকে ছড়ানো । ডান দিকের কোনায় একটা রিসেপশন কাউন্টার , সাদা রঙের চমতকার কিছু রিভলভিং চেয়ার আর মাঝখানে ছোট্ট একটি টেবিল ছাড়া আর কিছু নেই । কাঁচের দেয়াল থেকে বাইরের পৃথিবীকে খুব অপরিচিত লাগছে । এত উপর থেকে ম্যাঞ্চেস্টার শহরটাকে আগে কখনো দেখি নি । উপর থেকে সিটি সেন্টার টাকে খেলনার মত মনে হচ্ছে । কাউন্টারে বসে থাকা মেয়েটা অনেক্ষন ধরেই কোন নড়াচড়া করছে না । একদম মূর্তির মত কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে আছে । কি ট্রেনিং দেয়া হয়েছে কে জানে । কাছে গিয়ে খুব বিকট চিতকার করলে মেয়েটার কি অবস্থা হয় একটু দেখার ইচ্ছা । হঠাত করেই আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি রিন রিনে গলায় বলল, “ মি.রাশেদ আপনি ভেতরে যেতে পারেন ।” এতক্ষন ভয় লাগেনি । এখন কেমন জানি ভয় লাগছে । ভয় লাগলে আমার সাধারণত কপাল ঘামতে থাকে , মুখের থুথু শুকিয়ে যায় । আজকের দিনটা আমার জন্য বিশাল একটা ব্যাপার । কম্পাস গ্রুপের সাথে কোন কাজ করতে পারা যে কোন কোম্পানীর জন্য বিশাল একটা ব্যাপার বলেই আমার ধারনা । বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যাবসা । আমার এই প্রজেক্ট স্ট্র্যাটেজি যদি এদের পছন্দ হয় , আগামী তিন বছরের জন্য কন্ট্রাক্ট । বড় বড় রিটেইল শপ গুলোতে আমাদের স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী স্ট্রাকচার করা হবে ।

- আসতে পারি ?
- অবশ্যই । বসুন মি. রাশেদ । আমি ক্রিস পাইপ । কোম্পানীর একজন অতি তুচ্ছ চাকর , হা হা হা

এখানে হাসার কি আছে বুঝতে পারছি না । মধ্য বয়স্ক একজন লোক । প্রথম দেখাতে এই ভদ্রলোকের চেহারা দেখলে সবারই যা মনে হতে পারে তা হচ্ছে , চেহারায় কি যেন নেই । ফিনফিনে পাতলা সোনালী চুল । সাদা সার্টের সাথে হলুদ একটা টাই পরেছেন । দেখেই মনে হচ্ছে টাইটা যেন গলায় জোর করে পরানো হয়েছে ।

- মি. রাশেদ , আমরা কাজের কথায় চলে যাই । আমরা আপনার প্রজেক্টটা দেখেছি । সত্য কথা বলতে কি , খুব ক্রিয়েটিভ । কিন্তু সমস্যা হলো , রিটেইলের ক্ষেত্রে আমাদের সাধারণত খুব ইজি গোয়িং এবং ফ্রেন্ডলি প্রজেক্ট গুলোই ইন্ট্রোডিউস করতে হয় । আমার কাছে প্রজেক্টটা তেমন একটা পছন্দ হয়নি । কিন্তু প্রজেক্ট এডভাইজারদের সেভেন্টি পার্সেন্ট আপনার এই প্রজেক্টের পক্ষে । সুতরাং আমার দ্বিমত আর ধোপে টেকে নি । হা হা হা হা । কনগ্র্যাচুলেশন্স মি. রাশেদ । রিসেপশনের মিস.জেনিথ আপনাকে সব কাগজ পত্র বুঝিয়ে দিবে । বেস্ট অফ লাক ।

-মেনি থ্যাঙ্কস ক্রিস
- কিন্তু একটা ব্যাপার মি.রাশেদ । আমরা এখনি আপনার সাথে তিন বছরের কন্ট্রাক্টে যাচ্ছি না । প্রথম কন্ট্রাক্ট টা এক বছরের । তারপর যদি আমাদের মনে হয় কাস্টমার এই মেথড নিচ্ছে তাহলে আমরা কন্ট্রাক্ট আরো তিন বছরের জন্য যাব । আপনি কি এই শর্তে রাজি ?

এই বলে ভদ্রলোক আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এলেন ।

- হ্যাঁ । আমি রাজী । আসলে আমি জানি আমার এই প্রজেক্টটা আমি আরো বেশী ডিলে বিক্রি করতে পারতাম । কিছু করার নেই । আমার বাজে সময় যাচ্ছে ।

-আমরা জানি মি.রাশেদ । আমি দুঃখিত তার জন্য । সুযোগ এলে সেটা লুফে নেয়াই আমাদের স্ট্র্যটেজি । হা হা হা হা

কেন জানি ভদ্রলোকের কথার চাইতে তার চেহারার অপূর্ন অংশটাই আমার মাথার ভেতর কাজ করছিলো । এরকম একটা সংবাদে এই লোক যেমনই হোক না কেন , তাকে খুশিতে চুমু দিয়ে দেবার কথা । আমার কেন জানি কথাই বলতে ইছা করছে না । বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আগামী এক বছরে আমি একজন মিলিওনিয়ার হয়ে যাচ্ছি । ক্রিসের সাথে হাত মিলিয়ে চলে আসার সময় আমি তার চেহারার অপূর্ণ অংশটি ধরে ফেললাম । লোকটির চোখের ওপরে কোনো ভুরু নেই । কি কারনে যেন ঝরে গেছে ।

অফিস থেকে বের হয়েই চাচার “আর্ঝেন্ট” ফোনটি পেলাম । গতকাল প্রিয়তি তার প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছে । মৃত্যূর আগে ভাইয়াকে দেখার জন্য নাকি ক্রমাগত কাঁদছিলো । প্রিয়তির একটা মেয়ে হয়েছে । সে ভালো আছে ।

পরিশিষ্টঃ

আজকে রাতেও আমার ঘুম ভেঙ্গে গেছে । ঘামে পুরো শরীর ভিজে গেছে । স্বপ্নে যা দেখেছি তা ঠিক দুঃস্বপ্ন কিনা বুঝতে পারছি না । দেখেছি, আমার বাবা আমাদের কৃষ্ণচূড়া গাছটি জড়িয়ে ধরে আছেন । তার গায়ে কোন কাপড় নেই । প্রিয়তি ক্রমাগত কেঁদেই চলেছে , আমি তার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছি । আজকে ঘরে ইলেক্ট্রিসিটি থাকলেও, লাইট জ্বালাতে ইচ্ছা করছে না । আমার পাশের ড্রেপার্স স্ট্রীটের নিয়ন লাইট থেকে অস্পষ্ট একটা আলো এসে পড়েছে আমার ঘরে । সকালেই মনে হয় ঠিক করে দিয়ে গেছে । আবছা আলোতে কেমন জানি একটা বিষন্ন পরিবেশ তৈরী হয়েছে । আমার এই বাসার আশে পাশে খুব একটা বাড়ি ঘর নেই । তারপরেও কোথায় থেকে যেন মানুষের কথার আওয়াজ ভেসে আসছে । খুব ক্ষীন স্বরে । রাতের শব্দটা আজকে রাতে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে । খুট খাট শব্দ গুলোও আজ নেই । আমার খুব ইচ্ছা করছে আমাদের কৃষ্ণচূড়া গাছটির নীচে গিয়ে দাঁড়াতে । একা একা গাছটি নিশ্চই আগের মত দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । রাজ্যের সব বিষন্নতা নিয়ে আমাদের কৃষ্ণচূড়া গাছটি কি করে যেন বেঁচে আছে ।

আমার মাথায় আবার সেই ভোঁতা যন্ত্রনাটি শুরু হয়েছে । ভয়ানক একটা কষ্ট আমাকে বার বার গ্রাস করে ফেলতে লাগল । মরে যাবার মত ইচ্ছে সম্ভবত এরকম সময়েই হয় ।

অথচ এত সব কিছুর ভীড়েও আমাদের কৃষ্ণচূড়া গাছটির দুঃখ আমাকে খুব প্রবল ভাবে দুঃখিত করে গেল ।

অনু-পরমাণু

01awcax3iqjzwaaaabaaaaaaaaaaa_

উতসর্গ আর আবজাব -
কবি জিফরান খালেদ , প্রিয়তমেষু । হাজারো দুঃখ আর কষ্ট যে সন্তর্পনে লালন করে ।

এটা কি গল্প না কি বিষদ একটা বিষাদ বয়ান জানি না । এই লেখাটি শুরু করেছিলাম জুলাইয়ের আঠারো তারিখ দুইহাজার আটে । আজকে অক্টোবরের দশ তারিখ ,বছর পালটায় নাই । দুইহাজার আট ই আছে । মাঝখানের এই সময়টাতে আমি কোন গল্প লিখতে পারিনি কিংবা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি । একটা লেখা মানুষকে এতটা কষ্ট দিতে পারে এতটা যন্ত্রণা দিতে পারে আমি তা কখনোই ভাবিনি । লেখাটা যেমন ত্যাঁদড় , আমি তার থেকেও দুই কাঠি বেশী । সুতরাং অপেক্ষা আর অপেক্ষা । এত অপেক্ষার পর শেষ হলো আজ । ইচ্ছা করছে দুইটা ডিগবাজি খাই, কোল বালিশের মত গড়াগড়ি দেই… রাস্তায় গিয়ে প্রায় পাছা থেকে পড়ে যাওয়া প্যান্ট পরিহিত যুবক কে জিজ্ঞেস করি, “ ঘটনা কি ? প্যান্ট ঠিকমত পর গাধা !!…” আফসোস সভ্য সমাজে থাকি…করা হয়না কিছুই, বলাও না…

এক।
আমার কিছুই ভাল্লাগেনা । এই ধরনের একটি কথা আমার মাথায় বার বার আসলেও আমি ঠিক সে রকম করে বার বার বলতে পারি না । ভালো লাগা, না লাগা , মন খারাপ কিংবা ভালো নেই এই ব্যাপার গুলো একা একা মেনে নিতে ভাল্লাগে না । কাউকে না কাউকে বলতে ইচ্ছে হয় । বলাটা ঠিক কঠিন কিছুও নয় । মুখ দিয়ে খুব সহজেই এই কাজ টি করা যায় । কিন্তু আমার আশে পাশে সব মানুষ গুলোই এমন, যাদেরও কোন কিছুই ভাল্লাগেনা । সুতরাং মন খারাপ করার অতি জরুরী সংবাদটি কিংবা আমি ভালো নেই এই ব্যাপার গুলো আজকাল ঠিক জমে উঠেনা । তারপরেও আমার না ভালো লাগার ব্যাপারটি আমি কাউকে না কাউকে জানিয়ে দেই । আমার ভালো না লাগবার কথা শুনে আমার আশে পাশের মানুষগুলোর ঠিক তেমন ধরনের ভাবান্তর হয় না কিংবা তাদের চিন্তাগত তেমন একটা পরিবর্তন হয় না বলেই আমার ধারনা । কেবল মুখের অবস্থানগত একটা পরিবর্তন হয় । “ও আচ্ছা” জাতীয় বাক্যটি বলবার কারনেই কি না , কে জানে । আমি তাই আজকাল দীর্ঘক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি আর প্রায়ই ভাবার চেষ্টা করি এর শেষ কোথায় । অর্থহীন ভাবনা তো বটেই, আমার এপার্টমেন্ট ঘেঁসেই হাই স্ট্রীট ধরে প্রতিদিন অসংখ্য এবং গুনতে না পারার মত প্রচুর আর অচেনা মানুষ হেঁটে চলে যেতে থাকে । তাদের সবারই মনে হয় আমার মত “ভাল্লাগেনা” জাতীয় কষ্ট নেই । সবাই কেমন করে যেন হাসতে হাসতে চলে যেতে থাকে । সে হাসিকে আমি প্রায়ই খুব আনন্দিত, কম আনন্দিত , উচ্ছাসিত , উতফুল্য, এইসব মনগড়া ধারনা দিয়ে ঠিক-ঠাক করে নেই । আমি ঠিক ভেবে বের করতে পারিনা এইসব হাসির মূল অর্থ কি, আর কিই বা এমন কারন হলে মানুষ এমন করে হাসতে হাসতে সামনে চলে যেতে পারে । এইসব হাসির পেছনের মূল অর্থকেই কি তবে আমরা সুখ বলে থাকি ? কখনো সখনো আমি মানুষের এরকম আনন্দের রহস্য ভাবতে গিয়ে চূড়ান্ত কোন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই । তখন হেঁটে চলে যাওয়া মানুষ গুলোর মতন আমারো নাকের নীচের কাটা অংশটা লম্বায় বেড়ে যায় । আমি যাকে ক্ষীণ হাসি বলে থাকি । আমার এই হাসির পেছনে, সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবার একধরনের নিষ্ঠুর সুখ এলোপাথাড়ি ভাবে কাজ করতে থাকে । কখনো আমার খুব ইচ্ছে হয় একদিন কাউকে জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করি, ঘটনা কি ? কিন্তু আমি নেহায়েত একজন ভীতু মানুষ বলেই এই ধরনের চিন্তাগুলোকে কখনই খুব একটা পাত্তা দিতে পারিনা । সভ্য সমাজে বেঁচে থাকাটাই আসলে ভীষন একঘেঁয়ে , মন যা চায় তা ঠিক করা যায় না । পাশের ফ্ল্যাটে এক বয়ষ্ক কাপল থাকেন । আমার সাথে দেখা হলেই কেমন কাঁচুমাচু করে তাকান । একটা ভীত সন্ত্রস্ত অবয়ব বৃদ্ধের চোখে মুখে নিদারুন ভাবে ফুটে উঠে । আমার গোঁড়াতেই সন্দেহ ছিল আমি দেখতে কুতসিত । এই বৃদ্ধ কে যতবার সামনা সামনি দেখি ততবারই আমার চেহারা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত হই । মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে হয় গভীর রাতে বুড়োবুড়িকে ভয়ানক রকম ভয় দেখাই । এডগার এলেন পো’র গল্পগুলোর মতন । এইরকম একটা চিন্তা করে এক হেলোয়েনের উতসবে আমি কয়েকটা মুখোশ কিনে এনেছিলাম । মুখোশ না কিনলেও চলত । রাতের আলোতে আমাকে ভয়াবহ দেখায় । অনেক আগে আগুনে পুড়ে যাওয়া মুখের অংশবিশেষ দেখে আমি নিজেই আঁতকে উঠি । গভীর রাতে সে উদ্দেশ্যে দরজায় টোকাও দিয়েছিলাম । এরা হালুম শব্দের মানে বুঝবে কিনা এই সন্দেহ দূর না করেই মৃদু স্বরে হালুম বলেই খানিক্টা থেমে গেলাম । আমার নিজেরই কেমন যেন ভয় ভয় করছিলো । তারপর আর সাহসে কুলোয় নি । পরদিন এম্বুলেন্সের ভয়ানক বিকট চিতকারে ঘুম থেকে উঠে শুনি , দুই বৃদ্ধের একজন হাপিস । শ্বাস কষ্ট ছিলো নাকি বুড়োর । রাত তিনটার দিকে হাঁপানীর টান উঠেছিলো । মারা গেছে ভোর ছয়টার দিকে । কি করছিলাম আমি তখন ? বিকট মুখোশ টা পরে হাত পা ঝাঁকিয়ে আমার ঘরে নাচছিলাম মনে হয় । খানিকটা হেলে দুলে । বৃদ্ধের মৃত্যুটা আমাকে আরো বেশী সাহসী করে তুলেছিলো । এরই নাম ক্রুর হাসি কিনা জানিনা , তবে আমার বীভতষ মুখ জুড়ে একটা জঘন্য হাসি লেগেছিলো । সপ্তাহের শেষ দিনগুলোয় বুড়িকে একা পেয়ে ভয় দেখানো যাবে , এই ব্যাপারটি আমাকে প্রবল আনন্দ দিচ্ছিলো । কিন্তু দেখা গেলো পুরোপুরি নিয়ম ভেঙ্গে বুড়ির বড় মেয়ে, বেকি ( যার সাথে সব সময় একটা বিশাল গ্রে হাউন্ড থাকে ) মাল পত্র নিয়ে বুড়ির সাথে থাকতে চলে এলো । সারাদিন সে কি হল্লা হাটি , হাসা-হাসি । তাদের এই আনন্দ, সুখ আমার ভাল্লাগতো না । বেকি দেখতে খুব সুন্দরী ছিলো । বেকিকে আমি তার কুকুর গুলোর জন্য ভয় পেলেও, তার জন্য আমার মনে একটা জায়গা ছিলো । কি সুন্দর দেখতে বেকি । মোমের মুর্তির মতন । আমি কখনো দেখিনি বেকির প্যান্টি পুরোপুরি ঢাকা । ট্রাউজারের ফাঁক দিয়ে প্যান্টি দেখার লোভে আমি সবসময়ই বেকি কে নিরবে অনুসরন করতাম । গভীর রাতে আমি যখনই বৃদ্ধার ফোন নাম্বারে ডায়াল করতাম , প্রতিবারই আমাকে “পুটকির ফুটা” গালিটুকু শুনেই ফোন রাখতে হতো । কেননা ফোনে আমি কোন কথাই বলতে পারতাম না । একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে বেকি বলে উঠল, “ইজ ইট জ্যামশেড ? ”। কি এক তীব্র আতঙ্ক আমাকে ঘিরে ধরেছিলো সেদিন । বেকি কি করে যেন বুঝে ফেলেছে । এরপর অবশ্য আর কোনদিন ফোন করা হয় নি । ধরা পড়ে যাবার ভয়টা আমাকে সবসময় অনুসরণ করে চলত । এখন অবশ্য আমি প্রায় রাতে ঢাকায় ফোন দেই । গভীর রাতে ফোন করে কোন কথা বলি না । বেশীর ভাগ সময় ভাইয়া ফোন ধরে । ভাইয়া কলতাবাজার সাহিত্য পরিষদের সভাপতি । কি সুন্দর করে কথা বলে । তার কবিতার ভেতর কি চমতকার, চমতকার শব্দ । কি অসাধারণ গল্প লেখেন ভাইয়া । অনেক মেয়েকেই দেখেছি মন্ত্র মুগ্ধের মত ভাইয়ার কথা শোনে ,ভাইয়ার জন্য পাগল । অথচ সে ভাইয়া কি বিশ্রী করে “ কোন হাউয়ার পোলা রে” বলে গালি দেয় । এরকম একজন মানুষের মুখে “ হাউয়ার পোলা” শব্দটি ঠিক মেনে নেয়া যায় না । যখন থেকে আমার বখে যাওয়া শুরু , সব আত্মীয়-স্বজন ,মা ( আমার বাবাকে আমরা কেউ দেখিনি , উনি কোথায় থাকেন মা আমাদের বলেন নি ) আমাকে দেখলেই যখন আঁতকে উঠত , সে সময় গুলোতেও ভাইয়া আমাকে ছেড়ে যান নি । প্রতিদিন একে তাকে মেরে-ধরে, চাঁদাবাজি করে যখন ঘরে ফিরতাম , ভাইয়া আমার ঘরে এসে তার নতুন লেখা কবিতা শোনাতেন । আমার বালিশের নীচে রাখা রিভলবার দিয়ে আমার প্রায়ই ইচ্ছে হতো ভাইয়াকে একটা বাড়ি দেই । এতটা সুখী হয়ে কি করে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে আমি ভাইয়াকে দেখে কোনদিনই শিখে নিতে পারিনি । একটা খুনের মামলায় ফেঁসে গিয়ে আমেরিকা আসার সময় এই ভাইয়াই শুধু আমার সাথে এয়ারপোর্টে এসেছিলো । ওইদিনই প্রথমবারের মত ভাইয়াকে আমি কাঁদতে দেখেছিলাম ।

দুই এবং পরিশিষ্টঃ

সুখ ব্যাপারটা সম্পর্কে আজকে আমার ব্যাপক ধারনা হলো । অথচ এতটা বছর আমাকে কি সুতীব্র এক যন্ত্রনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিলো । কি করে যেন সব জেনে গেছি টাইপ একটা বোধ আমার মধ্যে পোলয়েড কনার মত অবরাম দৌড়ে যেতে থাকল । এখনো আমার এপার্টমেন্টটার নীচে তাকালে দেখা যাবে হাজার হাজার সব সুখী মানুষেরা বড় রাস্তাটি ধরে সামনে চলে যাচ্ছে । আগের মতন তাদের মুখ গুলো হাসি হাসি করে রাখা । শীত-গ্রীষ্ম , বর্ষা যাদের কখনই ছোঁয় না । আমার মুখে একধরনের ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠেছে । আমি ধীরে ধীরে এ হাসির অর্থ বুঝে নিতে পারছি । আমি হয়ত আর বড় জোর ঘন্টা তিনেক বেঁচে থাকব । যে বস্তু আমার ভেতরে গেছে সে সম্ভবত আমার মতই অসুখী । হাজার চেষ্টাতেও আর ফিরে আসা যাবেনা । ধীরে ধীরে আমি নিস্তেজ হতে শুরু করেছি । ঠিক কতদিন পর আমার সতকার হবে সে সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই নেই, পুলিশ ,এম্বুলেন্স কখন আসবে সেসবের কিছুই জানি না । অনেক পরিচিত-অপরিচিত মানুষ গুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই বেকি থাকবে । ঠিক আগের মতন । ইষত প্যান্টি দেখা যাবে তার ট্রাউজারের ফাঁক ঘেঁসে ।

অথচ তাকে বলাই হলো না আমি কি পরিমাণ সুখী ছিলাম ।

ঘানার লেখক মলাগোফরুমা’র “ এলিজি অফ মাইসেলফ” পড়ে অনুপ্রাণিত ।

এইসব দ্রাঘিমায়

01awcaxzjifqwaaaadaaaaaaaaaaa_

এক
পাউন্ড কয়েন টা বোধহয় গেলই । আজকাল ভেন্ডিং মেশিন গুলোর উপর ঠিক আস্থা রাখা যায় না । পয়সা টা দেবার আগেই আমি দুই তিন বার ভাবছিলাম দিব কি দিব না, এর আগেও কয়েকবার এরকম হয়েছে।এইজন্য লিভারপুল স্ট্রীটের ভেন্ডিং মেশিনটার কাছেও মাড়াই না।সেবার গিয়েছিলো একসাথে দুই পাউন্ড।এক পাউন্ডের কয়েন ছিলো না সাথে।নীচের কাভারে খুঁজতে গিয়ে দেখি কেউ একজন কলার খোসা ভাঁজ করে রেখে দিয়েছে। অনেক দিনের পুরোনো থাকাতে খুব বাজে একটা গন্ধ ছড়াচ্ছিল। আর আজকে ইউনিভার্সিটিতে। ইয়েস্টেন কে ডাকব কিনা ভাবছি। ওকে তো আবার পাওয়াও মুশকিল। বেশীর ভাগ সময়ই ইয়েস্টেন কে সেমিনার গ্যালারীর পাশে ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়।ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকি অর্ডার এর জন্য। কেউ নেই।বুঝিনা,ওইখানে ওর কাজ টা কি। ক্যান্টিনে যদি ক্যান্টিন বয় না থাকে তাহলে যে কি করে চলে ! মোল্লার দোকানের রতন কে মনে পড়ে গেলো।মাত্র দশ মিনিটের জন্য দোকেনের বাইরে ছিলো।তাতেই আমাদের মোদাচ্ছের ভাইয়ের কি রাগ। পারলে রতন কে ধরে কাঁচা খেয়ে ফেলে। সেবার ফেডারেশনের গৌতম’দা মোদাচ্ছের ভাইকে না ঠেকালে পরস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। পরে অবশ্য আমি রতনকে জিজ্ঞেশ করে জেনেছিলাম, চারুকলার গ্যালারীতে গিয়েছিলো । অহনা কায়সারের একক প্রদর্শনী চলছে। ভদ্রমহিলাকে দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল রতনের। সব সময় নাকি থাকেন না।তাই। রতনের কথায় ওইদিন খুব অবাক হয়েছিলাম। ওকে আমি নিরেট হাবাগোবা আর চা বানানোতে ওস্তাদ একজনই ভেবেছিলাম । মাঝে মাঝে আমাদের সবার চিন্তাতেই মনে হয় একটু ফাঁক আর একটা বৈষম্য থাকে। রতনকেও আমি ধরা-বাঁধা একটা গন্ডির মধ্যে চিন্তা করেছিলাম।

কে জানে আমাদের ইয়েস্টেনও এমন কিনা । গাঁজার নিরাপদ বিনিময় স্থান ছাড়া সেমিনার গ্যালারীর আশ-পাশের এলাকাকে আর দ্বিতীয় কারনে ভাগ করা খুব দুষ্কর। ইয়েস্টেনের গাঁজা প্রীতি সর্বজনবিদিত। নতুন আসা, হাঙ্গেরীর হাইনি’র কাছেও ইয়েস্টেন যা, আর ধেড়ে মার্কের কাছেও তা। সুতরাং অনেক আগে রতনকে শুধুই চা’আলা ভেবে যে মর্ম বেদনা পোহাতে হয়েছিলো,আজ হয়ত এক্ষেত্রে সেই বেদনার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে না। তার পরেও কথা থেকে যায়। কার মধ্যে যে কি আছে…এই জাতীয়।

দুই।

বাইরে চমতকার রোদ। পাউন্ড হারানোর শোকটা সহজেই ভুলে থাকা যায়। সামার তাহলে এসেই গেলো। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটানা বৃষ্টি একদম পাগল করে দিচ্ছিল। বৃষ্টি আমার একদম ভালো লাগে না । শেষ বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম বারো বছর আগে । তখন আমার দুইটা পা ই অক্ষত ছিলো। শাহানাকে নিয়ে ওটাই ছিল শেষ বৃষ্টিতে ভেজা । আহ্,..আবার শাহানার কথা মনে পড়ে গেলো । একদমই মনে করতে চাইনা। তারপরেও কি করে যেন এসে যায়। শাহানার দোষ-ত্রুটি নিয়ে আমি কখনই ভাবি না।আমার জীবনের সাথে শাহানা এমন ভাবে মিশে আছে যে, ওকে ঠিক ভোলাও সম্ভব হয়ে ওঠে না। ওকে দোষই বা দেই কি করে? খুব বেশী মানুষ কি আছে এই পৃথিবীতে, যে কিনা নিজে একজন সুস্থ-সবল,সাবলম্বী হয়ে শুধু ভালোবাসার মত একটা মানসিক কারনে আমার মত একজন পঙ্গুকে চিরদিনের জন্য কাছে টেনে নিবে? বাস্তবে হয়ত খুব কম হয়।আমার তা জানা নেই। আমি এই জন্য কোন কালেই শাহানাকে স্বার্থপর বলি নি। সত্যি কথা বলতে কি, আমার পঙ্গুত্ব নিয়ে আমি খুব লজ্জার মধ্যে থাকি।আমি জানি এইরকম ভাবা মোটেও ঠিক না।তারপরেও ভাবি। ভাবা-ভাবি ব্যাপারটাও আমার নিয়ন্ত্রনের মধ্যে নেই।থাকলে চেষ্টা করে দেখা যেত, আমি নিজেকে একজন গর্বিত মানুষ ভাবছি। কিংবা নিজেকে একজন ভয়াবহ সাহসী মানুষ মনে করছি, এই ভেবে যে , ক’জন পারে এত অস্ত্রে-সস্ত্রে সজ্জিত এইরকম ছিনতাই বাহিনীর কাছ থেকে একজন মানুষ কে রক্ষা করতে যেতে ? কিংবা কয়জনই বা পারে হাত থেকে রিভলবার টেনে নেবার সাহস দেখাতে ? আমি নিজেকে ঠিক ওইরকম গর্বিত করে ভাবতে পারি না । কেননা ওই যে বললাম,আমার চিন্তা ভাবনার ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রনের মধ্যে নেই ! থাকলে কি আর শুধু শুধু এত অস্ত্রের মধ্যে নিজেকে জড়াই ? কে চায় অস্ত্রের সামনা সামনি যেতে ? আমি বোধহয় নেহাত বোকাই ছিলাম। তা না হলে পা টা কেটে ফেলবার সময়েও কেন আমি প্রশ্ন করি, মেয়েটাকে মেরে ফেলেনি তো ?

শাহানার সাথে স্বাভাবিক ভাবেই আমার দুরত্ব বেড়ে গিয়েছিলো। ঠিক সিনেমা,নাটক কিংবা উপন্যাসের মত করে নয়। একদম স্বাভাবিক ভাবেই। বাস্তবে যা হয় আর কি । আমার পঙ্গুত্ব নিয়ে লজ্জা পাবার শুরু তখন থেকেই।শাহানা আমাকে হাসপাতালে দেখতে এলেই আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যেতাম। শাহানা বুঝত সে কথা। আমাকে বলেওছিলো। আমি ঠিক ওর কথা মত লজ্জাটাকে ফেলে দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি নি। আমি যখনই ভাবি শাহানা আমার পাশে নেই, তখনই মনে হয় হাসপাতালে দেয়া ওর বাণী গুলো ছিল নেহাত সান্তনার কথা । তা না হলে শাহানা যদি বলবেই, “তুমি একজন মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে গুলি খেয়েছ, তুমি তো আজ সবচাইতে গর্বিত” কিংবা “ তোমার একটা পা-ই শুধু নেই, তোমার বুদ্ধি আছে , মন আছে,শক্তি আছে,তুমি পারবে” সেক্ষেত্রে যুক্তি অনুযায়ী একজন গর্বিত, সাহসী, মেধা ও শক্তি সম্পন্ন মানুষ কে ছেড়ে শাহানা চলে যাবে কেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর কখনো পাওয়া যায় না, আর পাওয়া যাবার আশা করাটাও বোকামি। তাই আমি আর সে ব্যাপার গুলো নিয়ে ভাবতেই চাই না। কালে ভদ্রে এসে যায়। সেই এসে যাওয়াটাও আটকে রাখা মুশকিল।

তিন।

হাইড পার্কের গান্ধী মনুমেন্টের পাশ দিয়ে মে-ফেয়ারের দিকে যদি টানা হেঁটে যাওয়া যায় তারপরেও কুইন্সওয়ে ব্রীজের কাছে যেতে কমপক্ষে পয়তাল্লিশ মিনিট লাগে। আমার একটা পা নিয়েও আমি প্রায়ই এই সাহস দেখাই। পঙ্গু হবার পর থেকে আমার হাঁটা মনে হয় আরো বেড়ে গেছে। আগে ঢাকার রাস্তাতেও হাঁটতাম। তবে এখনকার মত নয়। কি জানি, মানুষের সামনে সবসময় লজ্জায় কুঁকড়ে থাকি বলেই হয়ত যখন একা থাকি খুব সাহসী হতে ইচ্ছে করে। এই জায়গায় কোন পরিচিত মানুষ দেখে ফেলবে না অথবা পরিচিত কোন মানুষ শাহানার মত সান্তনার বাণী শোনাবে না এই ধরনের নিশ্চয়তা আমাকে খুব স্বস্তি দেয়। একা রাস্তাতে যখন হাঁটি তখন আমার হাতে ধরা ক্রাচ আর বেঁচে থাকা অন্য আরেকটি পায়ের চমতকার একটা শব্দ হয়। ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠকা ঠক্ এই রকম। মাঝে মাঝে দুই একটা নিজের বানানো কথার সাথে অদ্ভুত সুর, খুব একটা খারাপ হয় না। নিজের মতন করে নেয়া আর কি। শধু বেঞ্চিতে বসে থাকা এক পাঁড় মাতাল তার প্রায় নিভু নিভু চোখ দিয়ে একদিন আমাকে জিজ্ঞেশ করেছিলো এটা কোন ইন্ডিয়ান মুভির গান কিনা। সেদিন অবশ্য মনে হয়েছিলো ,এটা যদি “হাম দিল দে চুকে সনম” কিংবা “তু কামিনে কুত্তা” ছবিরও গান হয় তাতে করে তার স্টেলা কিংবা কার্লসবার্গ বিয়ার কোনোটাই খাওয়া কমবে না। তাই প্রতি উত্তর অহেতুক মনে করে,আর জবাব দেয়া হয়নি। মনে আছে চলে যাবার সময় ঘোরে আচ্ছন্ন লোকটা চিত্‌কার করে আমাকে বলছিলো, “হেই ম্যান, টেল মি…হয়্যার হ্যাভ অল দা ফ্লাওয়ার্স গন… অল দা ফ্লাওয়ার্স গন…হা হা হা হা। ব্লাডি হেল…হা হা হা হা” আমি কিছুক্ষনের জন্য থমকে তার দিকে তাকিয়েছিলাম । খুব বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, আমি জানিনা কোথায় হারায়…জানিনা…

হাইডপার্কের ধু ধু মাঠে ঘাস ফুল ফুটেছে।কোনটা সাদা, কোনটা হলুদ। অন্ধকার আকাশে জ্বল জ্বলে নক্ষত্রের মত লাগছে।অনেক আগে শাহানার সাথে বসে দেখা নক্ষত্রের মত। আজকে পুরো মাঠ টাকেই অচেনা লাগছে। কত মানুষ এসেছে আজকে! সামারের ডাক ফেলে এখন আর কেউ ঘরে বসে থাকতে পারে না। সামার এলেই সবাই কেমন জানি বাউন্ডুলে আর ঘরছাড়া হয়ে যায়। অশান্ত লন্ডন আরো নির্ঘুম হয়ে যায়। আমার গন্তব্য কুইন্সওয়ে ব্রীজের দিকে। পিয়ার্সন ওইখানেই বেহালা বাজায়। পুরো পৃথিবীর দুঃখ পিয়ার্সন এক বেহালাতে কেমন করে বাজায়, কে জানে ! পিয়ার্সন আমাকে কথা দিয়েছে আমাকে আজ তার প্রিয় গান গুলো বাজিয়ে শোনাবে।ও নাকি কষ্টের গান ছাড়া বাজাতে পারে না।

প্রচন্ড রোদ উঠেছে। আর সামান্য একটু বাকী আছে রাস্তার। এই তো সামনের লেক টা পেরোলেই। আমি কেমন জানি বোধহীন জন্তুর মত হেঁটে চলছি। আবারো সেই একই শব্দ, ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠকা ঠক্ ।একটানা অবিরাম বেজেই চলছে। কেমন করে যেন টের পেলাম অনেকদিনের হাহাকার জমে আছে আমার কোথাও।এতকাল টের পাইনি বা পাবার চেষ্টা করিনি।

কতদিন হয়ে গেছে কাঁদিনি! ঠিক মনেও নেই।

অর্পিত অরণ্যে

a5

উত্‌সর্গঃ আনোয়ার সাদাত শিমুল। প্রিয় লেখক। প্রিয় ব্লগার।

এক.
একটানা ঘড় ঘড় শব্দ হচ্ছে। শব্দটা আসছে কোত্থেকে ? কিছু একটা একটানা ক্লান্তিহীন চলতে থাকলে যেরকম শব্দ হয় ঠিক সে রকম । শফিকের মনে হচ্ছে যুগের পর যুগ এই শব্দ হচ্ছে । উঠে গিয়ে একটু দেখতে পারলে হোতো । কোনভাবেই উঠতে ইচ্ছা করছে না । বুকের ব্যাথাটা মনে হয় বেড়েছে । আগের থেকে শ্বাস নিতে কষ্ট বেশী হচ্ছে । ইচ্ছে করলেই পাশে রাখা কলিংবেলে চাপ দেয়া যায় । বেল চাপার সাথে সাথেই মিসেস লিওনা হয়ত ছুটতে ছুটতে আসবেন । আতংকে অস্থির হয়ে যাওয়া তার লালচে গোলগাল মুখটা ভয়ে এতটুকু হয়ে যাবে। “ডোন্ট ওরি হানি” বলে প্রেশারটা মেপে , কাঁপা কাঁপা হাতে বুকের থেকে অদ্ভুত সব যন্ত্র গুলো নেড়ে দেখবেন । শফিকের মনে আছে , একবার তার বুক থেকে একটা প্লাগ কিভাবে যেন খুলে গিয়েছিলো । প্রচন্ড বুকের ব্যাথা আর একটু পানির জন্য সব কিছু যেন অন্ধকার হয়ে আসছিল । সেদিন বেল চাপার মত সামান্য শক্তিও ছিল না যে মিসেস লিওনা কে ডেকে একটু সাহায্যের জন্য বলবে । শফিক খুব অল্পতে বেঁচে গিয়েছিলো সেবার । অজ্ঞান হবার আগ মুহূর্তে শফিকের যতটুকু মনে পড়ে, একটা অস্পষ্ট বাক্য, ডোন্ট ওরি হানি…ডোন্ট ওরি হানি…।

এই মুহূর্তে অবশ্য কাউকেই ডাকতে ইচ্ছে করছে না শফিকের ।ব্যথাটা এরকম মাঝে মাঝে খুব কষ্ট দেয় । আবার কেমন করে যেন কমে যায় । একটু পর হয়ত আস্তে করে ব্যাথাটা কমে যাবে । শফিকের বদ্ধমূল ধারনা মিসেস লিওনা তার ঘরে বসে সারাদিন ঝিমায় । এই ধারনা হবার পেছনে শফিকের অনেক যুক্তি আছে । একজন ভদ্রমহিলা, যে কি না নার্স, তার চোখ সারাদিন লাল হয়ে থাকা কোন কাজের কথা না । শফিকের মনে পড়ে পরিমল বাবুর কথা । তার বাবার চেম্বারের মুহুরী । ভদ্রলোকের সবকিছুই কেতাদুরস্ত ছিল । ইস্ত্রী করা শার্ট,পরিষ্কার প্যান্ট । পালিশ করা জুতো । শুধু চোখটা সবসময় লাল হয়ে থাকত । দেখলেই মনে হোতো রেগে আছেন।বাবা বাঁজখাই গলায় “ পরিমল… বলে চেঁচিয়ে উঠলে , পরিমল বাবু ধড়মড়িয়ে হাজির হোতো । শফিকের যতটুকু মনে পড়ে সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে পরিমল বাবুর ঝিমানি শুরু হোতো । অবশ্য শফিকের বাবার খুব একটা পসার ছিলো না । এটা হতে পারে পরিমল বাবুর ঝিমানো রোগের বড় একটি কারন । শফিক চেম্বারে গেলে অবশ্য পরিমল বাবু খুব উতসাহ নিয়ে গল্প শুরু করতেন । সে গল্পের শুরু আবার ঘুম দিয়ে আর শেষ একটা সাদা শাড়ী দেখা দিয়ে। “বুঝলা ছোট মিয়া? তখন বাজে প্রায় রাত তিনটা…আমার তো আবার ঘুম খুব পাতলা, বুঝলা? দেখি কি ঘরের মধ্যে সাদা শাড়ী পরা কে যেন হাটে । আমি বললাম কে ওইখানে…কথা কয় না । আমার সাহস তো আর জানে না…উইঠা গিয়া জিজ্ঞাস করব, দেখি কেউ নাই…বুঝলা ছোট মিয়া? তোমাদের বাড়ীটা ভালো না । পিশাচ আছে ” শফিকের বলতে ইচ্ছে হয়েছিলো আপনি তো তেলাপোকা দেখলেই দৌড় দেন আর পিশাচ দেখে এগিয়ে গেলেন,গল্পটা না বানালেই কি হোতো না ? শফিক পরিমল বাবুকে কখনো বিব্রত করেনি । ভালই লাগত তার বানানো গল্প গুলো শুনতে । মাঝে মাঝে তিনি শফিককে তার ছোট বেলার গল্প শোনাতেন । যদিও সেই সব গল্পে তিনিই ছিলেন সব খেলায় পারদর্শী, যাত্রার নায়ক, মারপিটে ওস্তাদ, কোন একটি কিশোর দলের সেনাপতি । তারপরেও শফিক এই বানানো গল্পগুলো মন্ত্র মুগ্ধের মত শুনে যেত । বাবার কি এক কথায় যেন খুব রাগ করে তিনি একদিন চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলো । চলে যাবার আগে তিনি শফিক কে খুব অদ্ভুত একটা কথা বলে গিয়েছিলেন , “বাবারে, জীবনটা ছোট বলে দুঃখ কোরো না । শুধু ভেবে দেখবা, এই সময়ের মধ্যে কতটুকু বেঁচে ছিলা ।” শফিক এ কথার অর্থ সেদিন কিছুই বোঝেনি । পরিমল বাবুর চলে যাওয়াটাই তাকে খুব ভাবিয়েছিলো। লন্ডনে আসার আট বছর পর বাবার কাছ থেকে শুনেছিলো পরিমল বাবুর মৃত্যূর খবর ।নিওমোনিয়া হয়েছিলো । শফিকের ভাবতে খুব অবাক লাগে বাবার কাছ থেকে যেদিন পরিমল বাবুর মৃত্যূর সংবাদ পেয়েছিলো, সেদিন তার কষ্ট পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তার বদলে তার বার বার মনে হচ্ছিলো, এই চিরকুমার লোকটির শেষ মুহুর্তে কে পাশে ছিলো । মানুষের মন কি সবসময় এরকম অদ্ভুত ?শফিকের এখন অবশ্য খুব ইচ্ছা করছে মিসেস লিওনা কে ডেকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা আপনিও কি সাদা শাড়ী দেখেন ?” মিসেস লিওনা নিশ্চিত ভাবে তার গোলগাল মুখটা হাঁ করে শফিকের দিকে তাকিয়ে থাকবেন, তার গোলাপী জিব বেয়ে লালা পড়বার সম্ভাবনাও নাকচ করে দেয়া যায় না ।

দুই.

রেহনুমা যতক্ষন ঘরে থাকত শফিকের মনে হোতো এই ঘরে রেহনুমা আর শোপিস গুলো ছাড়া আর কিছু থাকা উচিত না । সারাদিন এটা মোছা,সেটা মোছা,তকতকে রাখা চাই প্রতিটি জিনিষ। শফিকের খুব অসহায় লাগত নিজেকে । শফিক কোনকালেই এত গোছানো ছিলো না। বিয়ের পরের জীবন এরকম কঠিন হয় কে জানত। তানিম,হাসিব দের সাথে একবার একটা দল করেছিলো শফিক। চিরকুমার ইউনাইটেড । যারা কোনদিন বিয়ে করবে না কিংবা প্রেমের নামও মুখে আনবে না । এইসব ক্ষেত্রে যা হয়, মাস তিনেক যেতে না যেতেই হাসিব তানজি’র সাথে ঝুলে পড়লো। এক বিকেলে হাসিব এসেছিলো ক্ষমা চাইতে।তানিম খুব চোটপাট করলেও শফিক কিছু বলতে পারে নি। রেহনুমার জন্য তখন থেকেই শফিকের কিছুটা দূর্বলতা ছিলো বলেই হয়ত হাসিব কে তানিমের মতন রেগে কিছু বলতে পারে নি শফিক। শুধু বলেছিলো, “হ্যাঁ… প্রেম জীবনে আসতেই পারে।তাই বলে বন্ধুদের না জানানো কাজের কথা না ।” তানিম অবশ্য খুব সন্দেহের দিকে তাকিয়েছিলো শফিকের এই ম্রিয়মান কন্ঠ শুনে। পরে রেহনুমার সাথে বিয়ে হবার পর তানিম রাগ করে আর যোগাযোগই করেনি। লন্ডন যাবার সময় এয়ারপোর্টে এসেছিলো তানিম। কিন্তু কথা বলেনি। চিরকুমার ইউনাইটেডে এখনো একমাত্র তানিম ঝুলে আছে। আজ এসব পুরোনো কথা মনে করে হাসি পায় শফিকের। রেহনুমার মৃত্যূর পর সব কিছু অর্থহীন লাগে শফিকের। কোন কিছুকে ভুলে যাবার চেষ্টা করাটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় বোকামী। কিছু ভুলে যাবার হলে তা মানুষ এমনি এমনিই হয়ত ভুলে যায়। ভায়োলিনের খুব শখ ছিলো রেহনুমার। শফিকের খুব অবাক লাগত সারাদিন অফিস করে,ঘরের কাজ শেষ করে রেহনুমা কি করে রাতের বেলায় ভায়োলিন নিয়ে বসত! যদিও ভুল কর্ডে বাজানো হতো বলে কিছুই হোতো না। তার পরেও শফিকের শুনতে বেশ লাগত। রেহনুমা যখন জন ডেনভারের গান গুলো তোলার চেষ্টা করত, তন্ময় হয়ে পায়ে তাল কাটত শফিক। কিছুক্ষনের জন্য অনেক দূরে হারিয়ে যাওয়া যেত। হঠাত করেই বাজানো বন্ধ করে দিত রেহনুমা । “আর ভাল্লাগছেনা” এই বলে। রেহনুমার এই ব্যাপারটাই অদ্ভুত লাগতো শফিকের কাছে। বিয়ের দশ বছরেও রেহনুমা’র এই “হঠাত্‌” রোগ টাকে বুঝে উঠতে পারেনি শফিক। রাত এগারোটায় তার মনে হোল অক্সফোর্ড স্ট্রীটে হাটতে যাবে। যে কথা সেই কাজ। কনকনে শীতের রাতে শফিকের ইচ্ছে না করলেও যেতে হোত। বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে অক্সফোর্ড স্ট্রীট পর্যন্ত যাবার মধ্যে কি ধরনের মাজেজা থাকতে পারে তা নিয়ে অনেক ভেবেও কূল-কিনারা করতে পারেনি শফিক। এক বিকেলে অফিস থেকে ফিরে শফিককে ধরে বসল কনসার্ট দেখতে যাবে। টিকিট শফিককে না জানিয়ে কাটা হয়েছে। সুতরাং না করবার কোন যুক্তি খুজে পেলো না । এই ধরনের কনসার্টে খুব আরাম করে ঘুমাতে পারে শফিক। নিকোলাই মেডিইয়েভ এর ভায়োলিন কনসার্টের কথা শুনে তাই কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিলো। বেটোফেন ,না কি যেন বাজাবেন ভদ্রলোক। তানিমের সাথে একবার পাবলিক লাইব্রেরীতে ওস্তাদ হাবিবুল্লাহ খাঁ’র রাগ ভৈরবী শুনতে গিয়ে টানা সাড়ে তিন ঘন্টা ঘুমিয়েছিলো শফিক ।

ভুলটা হয়ত তারই ছিলো । রেহনুমা এত করে বলেছিলো খারাপ লাগলে গাড়ী বের করবার দরকার নেই। ট্রেনে করেই যাওয়া যাবে। শফিক তবু জোর করেই ড্রাইভ করেছিলো সে দিন। যাবার সময় বুকের ব্যাথাটা কমই ছিলো।ফেরার পথে মনে হচ্ছিলো রাজ্যের সব ব্যাথা তার এই সামান্য বুকটাতে এসে আছড়ে পড়ছে। পাশে তুমুল স্পীডে আসা লরি টাকে দেখতে পায়নি শফিক। তাল হারানোর পর পর বাম দিকে চলে যাবার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। পাশের রাস্তায় ছিটকে পড়বার আগে যতটুকু মনে আছে,রেহনুমাকে হাত দিয়ে ধরার চেষ্টা করেছিলো শফিক।

তিন.

সার্জন কেইথ স্পিয়ারম্যান সকাল ন’টার দিকে একবার এসে শফিক কে দেখে যান।হাসি হাসি মুখে শফিকের সাথে নানা রকম অনর্থক জোকস বলার চেষ্টা করেন। তার কোন জোকস শুনেই শফিক এখন পর্যন্ত হেসেছে কিনা মনে করতে পারে না। কেইথের বেশীর ভাগ জোকসই কি কারনে যেন কুকুর বিষয়ক। যেমন আজ সকালেই এসে বলছে বুঝলে ইয়াং ম্যান একটা জোকস শোন…এক ভদ্রলোক তার আরেক বন্ধুকে বলছে, আমার কুকুরটার কোন লেজ নেই। পাশের বন্ধু জবাব দিলো,তাহলে তুমি কি করে বোঝ যে সে খুশি হয়েছে ? ভদ্রলোক জবাব দেয়, যখন সে আমাকে কামড়ানো বন্ধ করে। হা হা হা হা হা। শফিকের মনে হচ্ছিলো মানুষের দাঁত থাকে বত্রিশটা। এই ভদ্রলোকের মনে হয় বেয়াল্লিশ টা। এত দাঁত আসলো কোথথেকে। ডাক্তার ভদ্রলোককে দেখলেই ইদানীং মনে হয় এই লোকের মাথায় বড় ধরনের সমস্যা আছে। ডাক্তারী পাশ করল কিভাবে কে জানে ? সেদিন তাকে হাসতে হাসতে বলা শুরু করল, “ মিস্টার শফিক,হার্ট কিন্তু নব্বই ভাগ চলে গেছে।ম্যালফাংশান অব বোথ আর্টারী । তবে ভয়ের কিছু নেই” শফিক ডাক্তারকে জিজ্ঞেশ করেছিলো, “তাহলে কত ভাগ চলে গেলে ভয়ের কিছু থাকে?” কেইথ মনে হয় প্রশ্নটা শুনে মজা পেলো । আবারো তার সব দাঁত বের করে হাসতে লাগলো। ভেরী ফানি…ভেরী ফানি…হা হা হা …

আজকাল শফিকের নিজেকে কেমন যেন জড় পদার্থের মত লাগে। সারাদিন তার কাজ শুয়ে থাকা আর বিচ্ছিন্ন অতীত গুলো হাতড়ানো। রেহনুমা থাকলে নিশ্চই খুব বিরক্ত হতো।সারাদিন শুয়ে থাকা রেহনুমার খুব অপছন্দ ছিলো । ছুটির দিনেও নয়টার বেশী শুয়ে থাকা যেত না। এই নিয়ে খুব বিরক্ত হতো শফিক। কিন্তু কিছু বলা যেত না। কিছু বললেই রেহনুমা রাগ করে কিছু খাবে না।আর তার রাগ ভাঙ্গানোর সামর্থ কোন কালেই হয় নি শফিকের। রেহনুমার মৃত্যূর অনেক বছর পর্যন্ত শফিক তার সাথে দেখা করতে যায় নি।যে মানুষটার সাথে জীবনের পুরো অংশটাই বেঁধে রেখেছিলো তার সাথে এই ভাবে দেখা করতে যাবার কোন মানেই হয় না, এই যুক্তিতে আর যাওয়াই হয়নি। তার পরেও কি মনে করে যেন এক উইকেন্ডে রেহনুমার প্রিয় ফুল ক্রিসেন্থেমাস আর কিট ক্যাট নিয়ে গিয়েছিলো সাউথ এপিং এর গ্রেভিয়ার্ডে। কেমন যেন বিশাল অরন্যের মত লাগছিলো পুরো জায়গাটিকে। হঠাত্‌ করে ঘুমিয়ে যাওয়া মানুষ গুলো কেমন করে যেন সব রাজ্যের বিষন্নতা নিয়ে এখানে একসাথে এসে হাজির হয়েছে । একটা নামফলকে কে যেন লিখে রেখেছে, “আম্মু তুমি কবে আসবে?” শফিকের কি যেন হয়েছিলো সেদিন। এত কান্না যে কোথায় ছিল এতদিন ! রেহনুমার কবরে কি করে যেন একটা অচেনা ফুল গাছ জন্মেছে। ফুল গুলোও অদ্ভুত।থোকা থোকা হয়ে নক্ষত্রের মত জ্বল জ্বল করছে। ফুল খুব প্রিয় ছিল রেহনুমার, সে জন্যই মনে হয়।

পরিশিষ্টঃ
আবারো ঘড় ঘড় শব্দটা শুরু হয়েছে। এখন অবশ্য শুনতে খুব একটা খারাপ লাগছে না। মানুষের জীবনে সব কিছুই মনে হয়ে সয়ে যায়। যে কোন যন্ত্রণাই হোক। রেহনুমাকে হারানোর কষ্টটাও একদিন হয়ত ভুলে যাবে। সেন্ট থমাস হার্ট হাসপাতালের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে শফিকের খারাপ লাগে না। হাইওয়ের পাশে বিশাল বনে সব গাছে পাতা ধরেছে। সামার এসে গেছে মনে হয়। এই বিশাল বনটাকে কেমন যেন সমুদ্রের মত লাগে শফিকের । রেহনুমা থাকলে নিশ্চিত ভাবে বলত, “কেমন বিষন্ন দেখেছ?” তারপর হয়ত দূর থেকে গাছ গুলো গোনা শুরু করে দিত। এক…দুই…তিন…গুনতে গুনতে কিছুক্ষণ পর হাল ছেড়ে দিত রেহনুমা । শফিক সেই কখন থেকে গোনার চেষ্টা করে যাচ্ছে… পারছে না।

কে জানে, বিষন্নতা মনে হয় গুনে শেষ করা যায় না !

এপিটাফ

s6

উতসর্গঃ বাবাকে । আজকাল আমাকে ছাড়া যিনি ঘুমাতে পারেন না ।

এক।

মশাটাকে অনেক্ষন ধরে মারার চেষ্টা করছে মজিদ।মারাটা ঠিক হবে কি না এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা এই মুহূর্তে খুব জরুরী।রাত এগারটার মত বাজে।হাতে সময় কতক্ষন?আর বিশ মিনিট পরেও যদি সে ঘুমানোর চেষ্টা করে তাহলেও সর্বসাকুল্যে তার হাতে সময় আছে ছয় ঘন্টা চল্লিশ মিনিট।সেকেন্ডের হিসাব টা করতে পারলে ভালো হতো।এখন সেকেন্ডের হিসাবটাও জরুরী।মজিদ হাতের সিকো ফাইভ ঘড়িটার দিকে তাকায়।এগারোটা পাঁচ।তার শ্বশুর আলহাজ্ব শফিকুর রহমান বায়তুল মোকাররম থেকে নগদ চার হাজার চারশ পাঁচ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন।দোকান্দার কোনভাবেই ঘড়ি পাঁচ হাজারের নিচে দিবেনা।শফিকুর রহমানও নাছোড় বান্দা। মূলামূলির এক পর্যায়ে দোকানদার বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিল।রফা হলো চার হাজার চারশ টাকা।টাকা দেওয়ার সময় দোকানদার শুধু বিশ টাকা সম্মান হিশেবে চাইতেই আলহাজ্ব শফিকুর রহমান পাঁচ টাকার একটা ছেড়া নোট বের করে দিলেন।মজিদের এখনো স্পষ্ট মনে আছে দোকানদার পেছন থেকে “শালা খবিশ বুইড়া” বলে গাল দিয়েছিলো।

যেদিন তার শ্বশুর তাকে নিয়ে ঘড়ি কিনতে এলেন সেদিন অবশ্য ব্যাপারটা যৌতুক মনে করে মজিদের বেশ লজ্জা লেগেছিল।যৌতুকের ব্যাপারে মজিদ বরাবরি সোচ্চার।ক্লাস নাইনে থাকতে তাদের স্কুলে একটা সামাজিক সচেতনতা মূলক নাটক “যৌতুকের নষ্ট থাবা”তে মজিদের রোল ছিলো যৌতুক বিরোধী পাত্রের।সেইরকম রক্ত গরম করা ডায়লগ ছিলো

“আমি মানুষ,আমি বিক্রি হয়ে যাবার নোট নই বাবা!!! আমি আজ থেকে তোমাকে ত্যাগ করলাম”

তুমুল তালি পড়েছিলো ওইদিন।মজিদের মনে পড়ে স্কুলের মাঠে প্রায় হাজার তিনেক দর্শকের কম ছিল না সেদিন।

মজিদের অনেকদিনের শখ ছিলো একটা সিকো ফাইভ ঘড়ি পড়বার।অবশ্য আজো এই ঘড়িটাকে বেশ যত্ন করে রাখে মজিদ।যদিও সেকেন্ডের কাঁটাটা আজ দুই মাস হলো কাজ করে না।এতে অবশ্য তেমন কোন সমস্যা হচ্ছে না মজিদের।মনে মনে সেকেন্ড কল্পনা করে নেয়া কোন ঘটনাই না মজিদের কাছে।তার বাবা পীর কালাম বখস আলো দেখেই সময় বিচার করতেন।ছায়া যখন খুব ছোট দেখা যেত বাবা জোহরের নামাজের জন্য ব্যাস্ত হয়ে যেতেন।আবার ছায়া খানিকটা তেরছা হলেই বাবা বলতেন ,

ও মজিদ , কয়টা বাজে রে?

উত্তরের অপেক্ষা না করেই কালাম বখস নিজেই বলতেন,

তিনটা কুড়ি বারো সেকেন্ড।হইসে না?

হাতের ক্যাসিও ঘড়ি দেখে মজিদ সব সময়ি হ্যাঁ জাতীয় মাথা নাড়ত। কিন্তু কখনই বাবাকে বলা হয় নি তার মিনিট আর সেকেন্ডের হিসেব পুরাটাই ভুল। তবে মজিদের প্রায়ই ইচ্ছে হতো বাবাকে জিজ্ঞেশ করে কুড়ি আর সেকেন্ডের অমন পাক্কা হিসেবের ঘটনা কি?কিন্তু কি কারনে যেন আর বলতে ইচ্ছা হয় নি মজিদের।

দুই।

মজিদের প্রায় সময়ই কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা করেনা।কোর্টে যেদিন তার বউ আয়শা আক্তার মহামান্য আদালতে সাক্ষী দিলো যে,তার চোখের সামনেই তার স্বামী পীর মজিদ বখস তার আট বছরের সন্তান মতিন কে গলা টিপে মেরে ফেলেছে।সেদিনও মজিদ আয়েশার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারে নি। আয়েশার সে কি কান্না। হুজুর, এই খুনী আমার জীবন নিলেই পারত।আমার মতি…মতি…রে বলে পুরো কোর্টে মাতম তুলেছিলো আয়েশা।সেদিন অবশ্য মজিদের খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো আয়েশা কে জিজ্ঞেশ করে, কার জন্য এত বড় মিথ্যা বললা বউ?

কোন এক অদ্ভুত কারনে আর জিজ্ঞেশ করতে মন চায় নি মজিদের।ওই পক্ষের উকিল আমজাদ মিয়া যখন মজিদকে জেরা করা শুরু করল,

-আপনি কি করে পারলেন এই অবুঝ শিশু কে এইভাবে হত্যা করতে?

মজিদের তখন খুব বলতে ইচ্ছা হচ্ছিলো, ওই গাধা, তোর মুখ থেইকা তো গন্ধ বাইর হয়।আগে দাঁত মাইজা আয়।তার পর কথা কইস।

কিছু অবশ্য বলতে পারে নি মজিদ। সব কথা সব সময় মনে হয় বলা যায় না।মজিদ স্বীকার করে নিয়েছিলো, সে ই খুন করেছে তার শিশুপুত্র মতিন কে।আদালত তাকে যে শাস্তি দিবে তাই সে মাথা পেতে নিবে।মজিদের মনে আছে তার এই স্বীকারোক্তির পর আয়েশা কেমন অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে।

মজিদের মনে পড়ে,প্রথম যেদিন আয়েশা কে দেখেছিলো সারারাত ঘুমাতে পারে নি সে।এমন সুন্দর চোখ কোনদিন দেখেনি মজিদ।আহা তারপর কত কথা। ঠিকমত বাবার আড়তে মনযোগ দিতে পারত না মজিদ।সারাদিন ওই দুই চোখ।

আয়েশাদের বাড়ী ছিল পূব পাড়ায়।কলমাকান্দা পার হয়ে দুই টাকার রিকশা ভাড়া।পীর কালাম বখস একদিন বিরক্ত হয়েই বলে ফেললেন, তা কার মাইয়া রে মজিদ?
মজিদ খুব অবাক হয়েছিলো সেদিন।পরে তার মা মরিয়ুমুন্নেসাকে দিয়েই বলাতে হয়েছিলো আয়েশার কথা।

কি দিন গুলোই না গিয়েছিলো সেদিন।আড়তে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলো মজিদ।সারাদিন আয়েশার কাছে বসে থাক্তেই ভাল্লাগতো তার।আয়েশা কতবার বিরক্ত হয়ে বলত, কর কি? কামে যাও।পুরুষ মানুষ সারাদিন ঘরে।মাইনসে কি কয়!!খালি ত্যাক্ত করে।
মজিদের তবুও ত্যাক্ত করতে ভাল্লাগতো।

পাশের বাড়ীর বাবুল রে নিয়া কোনদিনই সন্দেহ ছিলো না মজিদের।নিয়মিত বাসায় আসত।মজিদ বরাবরি বাবুল রে স্নেহ করত। বাবুলও ভাবী ভাবী বলে জান দিয়ে ফেলত।অথচ এই বাবুলই… দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে মজিদ।

তিন।

জেল সুপার হাসেম রব্বানীকে দেখলেই মজিদের কোরবানীর গরুর কথা মনে হয়। কেমন তৈলাক্ত নাদুস-নুদুস চেহারা।মেয়েলোকের মত মিনমিনে গলা।গলার নীচের সাকিন টাও বেশ!মনে হয় এইমাত্র ঘি মেখে আসল।

-কি মজিদ কি খবর?কিছু খাইতে মন চায়?

মজিদের হাস ফাস লাগে।এত দিন এই সেলে সে ছিলো, কোনদিন ভয় লাগে নাই।অথচ আজকের ঘটনা কি।মৃত্যূ কি কাছে এসে গেছে? ভয়টা বরাবর একটু কমই ছিলো মজিদের।যেই বয়সে আলী মিয়ার গড়ের মাঠ রাতের বেলা পাড়ি দেয়া ছিল দুঃসাধ্য ঘটনা,সেই সময় বাজি ধরে মাঠ পার হতো মজিদ।

মজিদ ভাবে জেল সুপার হাসেম রব্বানী কে বলে, চায়ে ডুবানো বিস্কুট খাইতে মন চায়।

তার ছেলে মতিনের খুব প্রিয় ছিলো এই চায়ে ডুবানো বিস্কুট।আয়েশা যখনি মজিদ কে চা-বিস্কুট দিত, কোথথেকে যেন এসে হাজির হত মতিন। একবার চায়ের কাপ উলটে ফেলাতে খুব জোরে মতিন কে চড় দিয়েছিলো মজিদ।মতিনের চোখ ভিজে আসে।

জেল সুপার আবার জিজ্ঞেশ করে-
-কি মজিদ কথা কও না কেন্‌ ?কিছু খাইবা?
-শাপলার সালুন খাইতে মন চায় স্যার।নারিকেল দিয়া ঝোল ঝোল।

বলতেই চোখ ধরে আসে মজিদের।আয়েশা
খুব ভাল রাঁধত শাপলার সালুন। আয়েশা কি জানি দিত তরকারীতে,একবার খেলে সারাদিন খেতে ইচ্ছা করত মজিদের।

জেল সুপার অবাক হয়ে তাকায় মজিদের দিকে।বলে কি এই লোক ! একটু পর যার ফাঁসি হবে, সে কিনা শাপলার সালুন খেতে চায়!হাসেম রব্বানী অবশ্য এইসব ব্যাপারে অভ্যস্ত। ফাঁসির আসামীরা মৃত্যূর আগে এইরকম অদ্ভুত আবদার করে। গত বছর সেভেন মার্ডার মামলার আসামী কালু শেখ ফাঁসির আগে বেঁকে বসল।সে আখের রস খাবে। এই বস্তু না খেয়ে সে মরবে না। কি যন্ত্রনা যে হয়েছিলো সেইবার। আরে জেলখানা কি ক্যাফে কস্তুরী নাকি?যা খাওয়ার অর্ডার দিবে তাই পাওয়া যাবে?নিয়ম রক্ষার জন্য জিজ্ঞেশ করা। কিছু বলাও যায় না। একটু পরেই তো মরে যাবে। এইধরনের সিচুয়েশনে কিছু বলাও যায় না। বাবুর্চি হরিপদ কে বলে দেখতে হবে। শাপলার সালুন আছে নাকি কে জানে।এইটা কি শাপলার সিজন? মজিদের জন্য অবশ্য একটা টান আছে তার। গত তিরিশ বছরে মজিদের মত ভালো হাজতী পায় নাই হাসেম রব্বানী। কোন অভাব অভিযোগ,পাগলামী -ছাগলামী নাই। হাসেম রব্বানী’র বিশ্বাস হয় না এই সোজা লোকটা বাচ্চা কোন ছেলেকে গলা টিপে মারতে পারে। খুব ধান্দা লাগে তার।কি আজিব দুনিয়া!

কোনো আসামীর ফাঁসির সময়ের খবর পেলে হাসেম রব্বানী’র সবসময়ি জানতে মন চায় ,এখন তার কেমন লাগে? কিন্তু কোনভাবেই এই প্রশ্ন কাউকে করা সম্ভব না।মানুষ তাকে পাগল মনে করবে।কিন্তু মজিদ কে মনে হয় জিজ্ঞেস করা যাবে।সে হয়ত কিছু মনে করবে না। হাসেম রব্বানী প্রতিটি ফাঁসীর আসামীরই চোখের দিকে তাকায়।সবার চোখই কেমন জানি ঘোলাটে আর আবেগ শূন্য লাগে।মানুষ গুলো কেমন যেন স্থিতু হয়ে যায়।আচ্ছা, তার বাবার যখন ফাঁসি হয়েছিলো ষেশ মুহূর্তে তার কেমন লেগেছিলো?

হাসেম রব্বানীকে সম্পূর্ন অবাক করে দিয়ে মজিদ বলে উঠে, ভয় লাগে স্যার। ভয় লাগে।

চার।

মজিদ বখস এর দাদাজান পীর জালাল বখস সারাদিন মৃত্যূ নিয়ে উচু স্তরের কথা বার্তা বলতেন। বুঝলি্রে বেটা,

মৃত্যূ হইল আত্মার শুদ্ধি।ওই দেখ আমার পাশে আজ্রাইল খারাইয়া রইসে।দেখ আমার কথা শুইনা কেমনে হাসে…
অবশ্য আজ্রাইল সাহেব এরপর আরো ত্রিশ বছর দাঁড়িয়ে থেকে পীর জালাল বখসের আত্মা শুদ্ধ হতে নিয়ে গিয়েছিলো।

আচ্ছা আজকে যখন তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হবে আয্রাইল সাহেব কে কি দেখা যাবে? আত্মা শুদ্ধ করে এই লোকের লাভ কি? দাদাজানের কাছে তার আকার -আয়তনের অনেক গল্প শুনেছে মজিদ। ইয়া লম্বা। মুখ পোড়া। ঘন কৃষ্ণকায়। দেখলেই নাকি অর্ধেক মৃত্যূ। তার বাম হাতের কব্জির থেকে উপরের দিক পর্যন্ত ঝলসানো। গোলাপী ঠোঁট। কোঁকড়া চুল। খালি গা। মজিদের অবাক লাগে।এত বড় ফেরেস্তা, খালি গায়ে থাকার ঘটনা কি?

মজিদের হঠাত করে খুব আয়েশা কে দেখতে ইচ্ছে হয়।আচ্ছা আয়েশা কি করে এখন?সে কি জানে আজকে তার ফাঁসি? মজিদের খুব পানির তৃষ্ণা পেতে থাকে। মশাটাও খুব যন্ত্রনা দিচ্ছে। পিন পিন পিন পিন…
মতিন কেও মনে হয় দেখতে পেলো সে।তার কপালে কাজলের ফোঁটা দিতে মনে হয় ভুলে গেছে আয়েশা।

ও আয়েশা…আয়েশা…আমার মতু বাবারে সাজাইয়া দেও।প্যান্ট নষ্ট কইরা ফেলল তো! তুমি কর কি?সারাদিন ফোঁস ফোঁস কইরা ঘুমাইলে চলবে?মতু বাবা,তুমি এইদিকে আসো…আসো বাবার কাছে।এই…এইতো হইসে… কান্দে না।আহহারে…বেটা নাঙ্গু কেন রে?

আমার মতু লেংটা
সর্দি আলা ব্যাংটা
ব্যাং ডাকে ঘ্যাং ঘ্যাং
আমার মতু ব্যাং ব্যাং

বেটা দেখি আবার মুখ বেকা কইরা কান্দে।গুলু গুলু গুলু…ওরে সোনা রে…ওরে বাবা রে…

মজিদের কাছে জীবন টাকে খুব একটা খারাপ লাগে না।

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.